পুঁজিবাদ Capitalism

সূচনা:
সমগ্র বিশ্ব আজ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পুঁজিবাদী অর্থনীতির সাথে যুক্ত। বস্তুত পুঁজিবাদ একটি আগ্রাসী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। যে কোন ধরনের সমাজ ও অর্থনীতি পুঁজিবাদের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতিতে পুঁজিবাদ আজ অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং অনিবার্য ব্যবস্থা হিসাবে স্বীকৃত। পুঁজিবাদের বিভিন্ন সমালোচনা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় পুঁজিবাদ বিশ্ব অর্থনীতির মূল নিয়ন্ত্রক। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং সমাজতান্ত্রিক চীনের পুঁজিবাদী বিশ্বের সাথে সম্পুক্ততার মধ্য দিয়ে এ সত্য আরও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

সংজ্ঞাঃ
পুঁজিবাদ হলো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের প্রতিফলন। পুঁজিবাদ বলতে এমন একটি আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বুঝায় যেখানে উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা ও পুঁজির নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তির হাতে সংরক্ষিত থাকে এবং মুনাফা অর্জনের জন্য মুক্ত শ্রমিকের মাধ্যমে বাজারের জন্য উৎপাদন করা হয়।

প্রামাণ্য সংজ্ঞাঃ
অপপড়ৎফরহম ঃড় ঙীভড়ৎফ অফাধহপবফ খবধৎহবৎ’ং উরপঃরড়হধৎু- “ঈধঢ়রঃধষরংস রং ধহ বপড়হড়সরপ ংুংঃবস রহ যিরপয ধ পড়ঁহঃৎু’ং ঃৎধফব ধহফ রহফঁংঃৎু ধৎব পড়হঃৎড়ষষবফ নু ঢ়ৎরাধঃব ড়হিবৎং ভড়ৎ ঢ়ৎড়ভরঃ ৎধঃযবৎ ঃযধহ নু ঃযব ংঃধঃব.”
কধৎষ গধৎী এর মতে- “পুঁজিবাদ হলো সমাজ বিকাশের একটি স্তর যা সামন্তবাদ হতে উদ্ভূত হয়েছে, যেখানে উৎপাদন প্রণালী কিছু লোকের হাতে ন্যস্ত থাকে এবং এর মূল লক্ষ্য থাকে শ্রমজীবী থেকে অধিক শ্রম আদায় করে সর্বাধিক মুনাফা অর্জন করা।”
লেনিন এর মতে, “পুঁজিবাদ বলতে পণ্য উৎপাদনের ঐ উন্নত স্তর বুঝায় এখানে মনুষ্য শ্রমের উৎপাদন শুধু নয়। মনুষ্য শ্রম শক্তি নিজেই পণ্যে পরিনত হয়।”

সুতরাং বলা যায় যে, যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপকরণের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা থাকে এবং মুনাফার ভিত্তিতে উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়ে তাকেই পুঁজিবাদ বলা হয়। এতে ক্রেতা বা ভোগকারীর পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে এবং ভোক্তার ইচ্ছা অনুযায়ী উৎপাদন পরিচালিত হয়। একে “স্বাধীন উদ্যোগের অর্থনীত্”িও বলা হয়।

 পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্য ঃ
পুঁজিবাদ এর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। পুঁজিবাদ-কে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্যান্য ঋড়ৎস থেকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। সেগুলো হলো –

১. ব্যক্তি মালিকানা স্বীকৃত ঃ
পুঁজিবাদ-এর প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো এখানে ধন সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকৃত। পুঁজিবাদ-এ জমি, যন্ত্রপাতি, কলকারখানা এবং উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণের ব্যক্তিগত বা বেসরকারী মালিকানা স্বীকৃত। পুঁজিবাদ-এ পুঁজি ও সম্পদে রাষ্ট্রীয় অপেক্ষা ব্যক্তি মালিকানাকে অধিক গুরুত্ব দেয়। মূলতঃ পুঁজিবাদ এর ভিত্তিই হচ্ছে ব্যক্তিগত মালিকানা।

২. স্বল্পসংখ্যক মানুষের হাতে সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ঃ
পুঁজিবাদে খুব কম সংখ্যক মানুষই সম্পদ নিয়ন্ত্রন করতে পারে। গুটিকয়েক মানুষ বা কোম্পানী পুঁজিবাদী অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক বা চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এরাই সমাজের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অতিরিক্ত শ্রম শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে।

৩. অধিকাংশ মানুষ শ্রমজীবী ঃ
পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় ব্যাপক সংখ্যক মানুষ শ্রমিক হিসাবে কাজ করে। শ্রমই তাদের মূলধন। একজন পুঁজিপতি হাজার হাজার শ্রমিককে নিয়ন্ত্রণ করে। সমাজে পুঁজিপতি ও শ্রমিকের অনুপাতিক হার অত্যন্ত পার্থক্যমূলক।

৪. মুনাফা অর্জনই মূল লক্ষ্য ঃ
পুঁজিবাদ এর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মুনাফার উদ্দেশ্যে উৎপাদন পরিচালনা। এতে প্রত্যেক উৎপাদনকারীর মূল লক্ষ্য হলো সর্বাধিক মুনাফা অর্জন করা। এই ব্যবস্থায় উৎপাদনকারীরা সামাজিক কল্যাণের দিকে লক্ষ্য না রেখে শুধু মুনাফা অর্জনের জন্যই উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালনা করে।

৫. শ্রমিক শোষণ ঃ
পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সীমিত সংখ্যক লোকের হাতে উৎপাদন ক্ষমতা থাকে। স্বাভাবিক ভাবেই এই ধনীক শ্রেণী শ্রমজীবী মানুষের শ্রম ও শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে এবং তাদের শোষণ করে।

৬. শ্রেণী দ্বন্দ্ব ঃ
পুঁজিবাদ-এ শ্রেণী দ্বন্দ্ব বিরাজ করে। পুঁজিপতি ও শিক্ষাপতিরা শ্রমিকদেরকে শোষণ করে। ফলে শোষক ও শোষিতের মধ্যে দ্বন্দ্বের ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়।

৭. ব্যক্তিগত উদ্যোগের স্বাধীনতা ঃ
পুঁজিবাদ-এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত উদ্যোগের স্বাধীনতা। এতে প্রত্যেক ব্যক্তি উৎপাদন ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ভোগ করে। প্রত্যেকে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী যে কোন পেশা গ্রহণ করতে পারে বা যে কোন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। এ জন্য পুঁজিবাদ-কে “স্বাধীন উদ্যোগের অর্থনীতি” ও বলা হয়।

৮. বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে পণ্য উৎপাদন ঃ
পুঁজিবাদী অর্থনীতি বিকাশের মূলে বাজারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যপক উৎপাদন বাজারেই বিক্রয় হয়ে থাকে। তাই পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় বাজার ব্যবস্থা একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।

৯. ভোক্তা স্বাধীনতা ঃ
পুঁজিবাদ-এ পত্যেক ব্যক্তি ভোগের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ভোগ করে। প্রত্যেকে নিজের পছন্দমত বিভিন্ন দ্রব্য ক্রয় করতে পারে। পুঁজিবাদ-এ ভোক্তার রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। এই জন্য বলা হয় পুঁজিবাদ-এ ভোগকারী সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।

১০. স্বয়ংক্রিয় মূল্য ব্যবস্থা ঃ
পুঁজিবাদ-এর আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো স্বয়ংক্রিয় মুল্য ব্যবস্থা। এখানে উৎপাদন ও বণ্টন নিয়ন্ত্রনের জন্য কোন কর্তৃপক্ষ থাকে না। ভোক্তাদের চাহিদা এবং উৎপাদনকারীদের যোগান দ্বারা আপনা আপনি বাজারের দ্রব্যসামগ্রীর দাম নির্ধারিত হয়। এই স্বয়ংক্রিয় মূল্য ব্যবস্থা দ্বারাই উৎপাদন, বিনিময়, বণ্টন যাবতীয় বিষয় পরিচালিত হয় এবং অর্থনীতিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

১১. মুদ্রা ব্যবস্থা ঃ
পুঁজিবাদ-এর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মুদ্রা অর্থনীতি বা মুদ্রার ব্যবহার। বিনিময় প্রথার মাধ্যমে পুঁজিবাদ-এর উদ্ভব ও বিকাশ হল্ওে বর্তমানে মুদ্রাব্যবস্থা ব্যতীত কেনা-বেঁচা, লেনদেন, বিনিময় কোনটিই সম্ভব নয়।

১২. মুক্ত শ্রমিকই শ্রমের মূল উৎস ঃ
দাস ও সামন্ত যুগে মুক্ত শ্রমিক ছিল না, কিন্তু পুঁজিবাদে মুক্ত ও স্বাধীন শ্রমিক অন্যতম পূর্বশত। মুক্ত শ্রমিক ব্যতীত পুঁজিবাদ বিকশিত হত কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। তাই মুক্ত শ্রমিক পুঁজিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

১৩. প্রতিযোগীমূলক বাজার ব্যবস্থা ঃ
এ ব্যবস্থায় যে কোন ব্যক্তি তার ইচ্ছা অনুযায়ী বাজারে পণ্য নিয়ে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করতে পারে ফলে বাজারে এক ধরণের প্রতিযোগীতার সৃষ্টি হয়।

১৪. প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার ঃ
আধুনিক পুঁজিবাদ উৎকর্ষের মূলে প্রযুক্তির অবদান সর্বাধিক। উৎপাদন, প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ক্ষেত্রে পযুক্তির ব্যবহার অনিবার্য। বস্তুতপক্ষে প্রযুক্তির ও ব্যাপক প্রথার ও ব্যবহার পুঁজিবাদী অর্থনীতির আমল পরিবর্তন করেছে। পুঁজিবাদী উৎপাদন বা আর্থ সামাজিক অবস্থানের প্রতিটি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষ্যনীয় এ কারনেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে প্রযুক্তিকে পৃথক করার কোন সুযোগ নেই।

উপসংহার ঃ
দাস ও সামন্তবাদের ন্যায় পুঁজিবাদ ও এর বৈশিষ্ট্য দ্বারা একটি নির্দিষ্ট সমাজ ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত। মানুষের মাঝে এক ধরণের মোহ তৈরি করে পুঁজিবাদ। যে কারণেই কেবল শিল্পক্ষেত্রে নয় বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্রেও পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্য ধারণ করছে।

 পুঁজিবাদের উন্নয়নস্তর ঃ
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নি¤েœাক্ত স্তরে ভাগ করা যায়। যেমন ঃ
১. বণিক ধনতন্ত্র (ঈড়সসবৎপরধষ ঈধঢ়রঃধষরংস)
২. শিল্প ভিত্তিক ধনতন্ত্র (ওহফঁংঃৎরধষ ঈধঢ়রঃধষরংস)
৩. অর্থনৈতিক বা পুঁজিবিনিয়োগ ধনতন্ত্র (ঋরহধহপব ঈধঢ়রঃধষরংস)

নি¤েœ এগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হল ঃ
১. ব্যবসায়িক বা বণিক ধনতন্ত্র (ঈড়সসবৎপরধষ ঈধঢ়রঃধষরংস):
বিভিন্ন সমাজে বিশেষত প্রবীণ ও সামন্ততান্ত্রিক যুগে বণিক ধনতন্ত্রের উন্মেষ ঘটে। বনিক ধনতন্ত্রের মুখ্য বৈশিষ্ট্য সমূহ নি¤œরূপ –

ক)     গ্রীস, রোম ও মিসর প্রভৃতি স্থানে সামন্ততান্ত্রিক বা প্রবীন যুগে একটি ব্যবসায়িক বা বণিক দলের উদ্ভব ঘটে। সেখানে জাতীয় ও  আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রবর্তিত হয় যা সম্পদ সঞ্চয় ও মূলধন সংগঠনের সুযোগ করে দেয়।

খ)     ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে কেন্দ্র করে এর পারিপার্শ্বিক এলাকায় বাজার ও মেলা বসত বলে গীর্জা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পালন করত। প্রায় চৌদ্দশ বছর পূর্বে ইসলাম পূর্ব যুগে পবিত্র কাবা গৃহের চতুর্পাশে বিরাট মেলা বসত। বণিক ধনতন্ত্রের যুগে পাশ্চাত্য দেশীয় লোকেরা অনেক অভিযানের সূচনা করেছিল এবং তারা ব্যবসায় বাণিজ্যের সম্প্রসারণের সম্পর্কে নতুন নতুন দেশ ও রাস্তা খুঁজে বের করতে সমর্থ হয়েছিল।

গ)     জাহাজ শিল্পের উন্নতির ফলে বহু জাতির পক্ষেই ব্যবসার বাণিজ্য সহজসাধ্য হয়ে ওঠে। বণিকরা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যকারী প্রেরণ করতে সক্ষম হয়। এর ফলে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। উল্লেখযোগ্য যে, উপনিবেশিকতা ছিল এ যুগের অন্যতম দিক। উপনিবেশগুলো বিজয়ীদের দেশি পণ্যের একচেটিয়া বাজারে পরিণত হল। উদাহরণস্বরূপ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বঙ্গ ভারত উপমহাদেশে একচেটিয়া বাজার লাভে সমর্থ হয়েছিল।

ঘ)     বণিক ধনতন্ত্রের প্রসারে কতিপয় আদর্শবাদী, কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সামন্ততান্ত্রিক যুগে মানুষ আদর্শ ও ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে গমন করত। এসবই পরিণামে বনিক ধনতন্ত্রের প্রসারে সহায়তা করেছিল।

২. শিল্পভিত্তিক ধনতন্ত্র (ওহফঁংঃৎরধষ ঈধঢ়রঃধষরংস):
কারিগরি ও সংগঠনের ক্ষেত্রে আমুল পরিবর্তন সূচিত হওয়ার ফলস্বরূপ কৃষি ও শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। এর ফলে একটি ভিন্ন প্রকৃতির সামাজিক অর্থনীতির উদ্ভব ঘটে। একেই শিল্পভিত্তিক ধনতন্ত্র বলে। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে নেপোলিয়ানের যুদ্ধের পর থেকে সামাজিক অর্থনীতি ক্রমশ প্রসার লাভ করতে থাকে। শিল্পে বিশেষত বস্ত্রবয়ন শিল্পে যান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের সাথে সাথে ইংল্যান্ডে প্রথমে শিল্পভিত্তিক ধনতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। জেমস ওয়াট ও জর্জ ষ্টিকেনসন কর্তৃক বাষ্পচালিত ইঞ্জিন আবিষ্কার এবং কলের চরকা আবিষ্কারের দ্বারা এ শিল্পাগ্রগতিতে ত্বরণ সৃষ্টি হয়েছিল। ইংল্যান্ডে প্রথমে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল বলে সে দেশই সর্বপ্রথম শিল্পভিত্তিক ধনতান্ত্রিক দেশের মর্যাদালাভের সুযোগ পায়। তবে অনেক পন্ডিতের মতে ভারত হতে সম্পদ লুণ্ঠনের পরেই ইংল্যান্ড শিল্পভিত্তিক ধনতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে।

শিল্পভিত্তিক ধনতন্ত্রের রাজনৈতিক উদারবাদ ছিল এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অত্যন্ত মুক্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর শ্লোগান ছিল খধরংংবু  ভধরৎব অর্থাৎ মানবকে মুক্ত করা। ঐধৎফ সড়হবু অর্থাৎ বিধিনিষেধমুক্ত স্বর্ণমুদ্রা, নিদেনপক্ষে সম্পদ অর্জনের ঘোর প্রবণতা ছিল শিল্পভিত্তিক ধনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। এ যুগে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি প্রগাঢ় সম্মান প্রদর্শন করা হত। গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এতই বৃদ্ধি পায় যে, শিল্পভিত্তিক ধনতন্ত্রের অধিকাংশ সার্বজনীন ভোটাধিকার ও গোপন ব্যালটে ভোট গ্রহণ প্রথা প্রচলিত হয়।

৩. পুঁজি বিনিয়োগ ধনতন্ত্র (ঋরহধহপব ঈধঢ়রঃধষরংস):
অর্থনৈতিক মহাসংকটের পর বিপুল সমৃদ্ধির যাত্রা পরিলক্ষিত হয়। নয়া বৈদ্যুতিক, রসায়নিক, স্বয়ংক্রিয় শক্তি চালিত যানবাহন ও বরার শিল্পকারখানার বদৌলতে এ সমৃদ্ধি চালিত হয়েছিল। এ সমৃদ্ধির সূত্র ধরে অর্থনৈতিক সম্পদ সমাবেশ ও পুঁজি সংগঠনের সাফল্য অর্জিত হওয়ায় বিংশ শতাব্দীতে আরেকটি শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠে। সময় অথবা শিল্পকারখানার ব্যবহার যন্ত্রপাতির কারিগরী কৌশলগত দিক যাই থাকুক না কেন আধুনিক ধনতন্ত্র সর্বতোভাবে অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। এ ধনতন্ত্র বেসরকারি ও সরকারি খাতে অর্থসংস্থান আকারে বিনিয়োগ ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধনতন্ত্র বলতে কতিপয় উন্নত দেশ কর্তৃক কতিপয় সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী মাফিক উন্নয়নশীল দেশের বিভিন্ন প্রকল্প ও খাঁতে পুঁজি বিনিয়োগ বুঝানো হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ আমেরিকা, ব্রিটেন, সোভিয়েত রাশিয়া প্রভৃতি দেশ পাকিস্তান, ভারত ও অনুরূপ অপরাপর দেশের বিভিন্ন শিল্প প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। আধুনিক ধনতন্ত্র যদিও বৈশিষ্ট্যর দিক হতে অর্থসংস্থান বা পুঁজি বিনিয়োগ ধনতন্ত্র তথাপি প্রকৃত প্রস্তাবে এ ধনতন্ত্রকে বণিক, শিল্পভিত্তিক ও পুঁজি বিনিয়োগ ধনতন্ত্রের সমন্বয় বলা যায়।

কার্ল মার্কসের মতে পুঁজিবাদের উন্মেষের স্তর ঃ
কার্ল মার্কসের মতে, সামন্ততন্ত্রের গর্ভেই ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার বীজ নিহিত ছিল। ক্রমবিকাশের প্রক্রিয়ায় ধনতন্ত্র দুটি স্তর অতিক্রম করেছিল। যেমন ঃ
– প্রাক একচেটিয়া (চৎব সড়হড়ঢ়ড়ষু)
– একচেটিয়া (গড়হড়ঢ়ড়ষু)

এ উভয় স্তরের একটি সাধারণ অর্থনৈতিক ভিত্তি আছে। উৎপাদন ব্যবস্থার ব্যক্তিগত পুঁজিবাদী মালিকানা ও মজুরির বিনিময়ে নিযুক্ত শ্রমিককে শোষণ প্রাক-একচেটিয়া ধনতন্ত্রের লক্ষ্য পথ নির্ধারিত ছিল। ধনতন্ত্র উন্মেষের ক্ষেত্রে যখন মুক্ত প্রতিযোগিতা ও কমবেশি সুস্থির গতিতে ব্যাপক ভিত্তিক উৎপাদনশীল শক্তির উন্মেষ ঘটেছিল, সেটাই প্রাক-একচেটিয়া ধনতন্ত্রের যুগ। তবে একচেটিয়া যুগে প্রতিযোগিতা ও উৎপাদন আবার মুষ্টিমেয় লোকের কুক্ষিগত হয়ে পড়ে।

ম্যাক্সওয়েবার এর মতে, সংশ্লিষ্ট প্রয়োজন নির্বিশেষে যখনই কোন এক মানব সমাজের জন্য ব্যবসায়িক উদ্যম আকারে শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থার প্রচলন ঘটেছিল, তথায় পুঁজিবাদের উন্মেষ ঘটে। আর ও সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে আধুনিক হিসাব সংরক্ষণ পদ্ধতি, মুনাফা ও লাভ লোকসান নির্ণয় পদ্ধতিতে যখনই আয় উপার্জনের ক্ষমতা নির্ধারণ করা শুরু হয়, তখন থেকেই প্রকৃত ধনতন্ত্রের উন্মেষ ঘটে।

 পুঁজিবাদের উৎপত্তি ও অগ্রগতির জন্য দায়ী কারণ ঃ
দু’জন বিখ্যাত মনীষী ম্যাক্স ওয়েবার ও কার্ল মার্কস পুঁজিবাদের উদ্ভবের কারণসমুহ বিশ্লেষণ করার জন্য যথেষ্ট সময় ব্যয় করেছিলেন। তবে ধনতন্ত্রের উদ্ভবের কারণ নির্দেশে ম্যাক্স ওয়েবার কার্ল মার্কসের সাথে দ্বিমত পোষন করেছিলেন। ম্যাক্স ওয়েবারের বিশ্লেষণ প্রধানত প্রোটেস্টান্ট নীতিশাস্ত্র ও যুক্তিবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।

যুক্তিবাদ বলতে তিনি জীবনের মানোন্নয়নে মানবীয় চিন্তাধারয় ক্রমবিকাশ বুঝিয়েছিলেন। তাই ওয়েবারের মতে, মানুষ জীবনের মান উন্নয়নের জন্য যখন সম্পদ সংগ্রহ ও সঞ্চয় করল তখনই ধীরে ধীরে পুঁজিবাদের উদ্ভব ঘটল। অপরপক্ষে কার্ল মার্কস পুঁজিবাদ উদ্ভবের কারণ খুঁজতে গিয়ে বৈষয়িক ও স্তুতান্ত্রিক দিকের উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

ধনতন্ত্র উদ্ভবের জন্য প্রধানত দু’টি কারণ দায়ী। সেগুলো হলো-
ক) অর্থনৈতিক কারণ এবং
খ) রাজনৈতিক কারণ
এ দু’টি প্রধান কারণকে কয়েকটি উপকরণে ভাগ করা যায়। ম্যাক্স ওয়েবারের মতে, পাশ্চাত্য দেশসমূহে পুঁজিবাদ উন্মেষের বাহ্যিক কারণগুলো নি¤œরূপ ঃ

১।    যোগাযোগ    ৫।    শিল্প কলাকৌশলের উদ্ভব
২।    প্রথম মহা ফটকাবাজারী সংকট    ৬।    নাগরিকত্ব সম্পর্কিত ধারণা
৩।    মুক্ত পাইকারী ব্যবসায়    ৭।    যুক্তিবাদী রাষ্ট্র এবং এর অর্থনৈতিক ্ও প্রশাসনিক নীতি
৪।    ষষ্ঠদশ হতে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ঔপনিবেশিক নীতি    ৮।    পুঁজিবাদী ভাববোধের মূল্যায়ন

অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে ছিল ঃ
১।    সামাজিক শক্তির অভ্যুদয় এবং সামাজিক শ্রমবিভাগ    ৮।    সামন্ততান্ত্রিক সমাজের অবসান
২।    পুঁজি সংগঠনের জন্য ঐতিহাসিক পূর্বশর্তাবলী    ৯।    বণিক শ্রেণী উদ্ভব
৩।    পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও সমন্বয়    ১০।    আদর্শগত উপাদান
৪।    যান্ত্রিক শক্তি প্রয়োগে কলকারখানায় বৃহদায়তন উৎপাদন     ১১।    বর্জুয়া শ্রেণীর উদ্ভব
৫।    জটিল ও উচ্চ দক্ষতাপূর্ণ কারিগরি উদ্ভাবন    ১২।    অর্থ ও অর্থনীতির ভূমিকা
৬।    বলপূর্বক কৃষক সাধারণকে ন্যায়সঙ্গত অধিকার হতে বঞ্চিতকরণ     ১৩।    আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার
৭।    রাষ্ট্রীয় ঋণ ও ছত্রছায়া

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: