উৎপাদন পদ্ধতি: Mode of production

উৎপাদন পদ্ধতি:
উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের সংযোগ এবং তাদের ঐক্যের প্রতিভূরুপে গড়ে ওঠে উৎপাদন পদ্ধতি। উৎপাদন শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্ক দু’টো পৃথক সত্ত্বা, কিন্তু বিচ্ছিন্ন সত্ত্বা নয়। তারা গতিশীলভাবে পরস্পর নির্ভরশীল। যেসব উপাদানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে উৎপাদন পদ্ধতি, তা নি¤েœ প্রদর্শিত চার্ট থেকে অনুধাবন করা যায় ঃ

উৎপাদন শক্তিসমূহ পরিবর্তনশীল। উৎপাদনের যন্ত্রপাতির উন্নয়ন এবং জনগনের ক্রমবর্ধমান অভিজ্ঞতা উৎপাদন-শক্তিকে অনবরত বৃদ্ধি করতে থাকে। উৎপাদন শক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কও পরিবর্তিত হয়। নতুন উৎপাদন শক্তি উৎপাদন পদ্ধতি পরিবর্তন করে, মানুষের জীবন ধারণের প্রণালীকে পরিবর্তিত করে। ফলে সামাজিক সম্পর্কসমূহও পরিবর্তিত হয়। উদাহরণস্বররূপ, হস্তচালিত মিলগুলো সূত্রপাত করেছিল সামন্ততন্ত্র, আর বাস্পচালিত মিলগুলো সূত্রপাত করেছিল ধনতন্ত্রের। উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন আবার উৎপাদন শক্তি সমূহের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। যখন উৎপাদন শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্কের বিকাশ সুসঙ্গত ও সুসমন্বিতভাবে তখন সমাজ বিকাশের ধারাও চলতে থাকে অপ্রতিহত গতিতে। কিন্তু যখন তাদের বিকাশে গরমিল দেখা দেয়, তখন সমাজ বিকাশের ধারাও প্রতিহত হয়।
উৎপাদন শক্তির বিকাশের একেকটি নির্দিষ্ট স্তরের সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্ক সম্পৃক্ত থাকে। অন্য কথায়, উৎপাদন শক্তির বিকাশের একটি নির্দিষ্ট স্তর তার সহগামী এবং যথোপযুক্ত উৎপাদন সম্পর্ককে অপরিহার্য করে তোলে। এটা এক গুর”ত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিধি- মার্কসের এক মৌল অবদান। এ বিধি সমাজ বিকাশ ও বিবর্তনের অর্থনৈতিক কারণ নিদের্শ করে। যখন উৎপাদন সম্পর্ক বিকাশ উৎপাদন শক্তির বিকাশ থেকে পিছিয়ে থাকে, অর্থাৎ, যখন উৎপাদন সম্পর্ক অচল হয়ে পড়ে এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিকাশকে প্রতিহত করতে থাকে, তখন নতুন উৎপাদন সম্পর্ক পুরাতন উৎপাদন সম্পর্ককে উচ্ছেদ করে, পুরাতন উৎপাদন পদ্ধতিকে পরিবর্তিত করে।
উৎপাদন পদ্ধতি সমাজ ব্যবস্থার মূল-কাঠামো নির্ধারণ করে। এ মূল কাঠামোকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সমাজের উপরিকাঠামো। রাজনীতি, ধর্ম, আইন, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, শিল্প ও কলা প্রভৃতির রূপ এবং সংগঠন হচ্ছে সমাজের উপরিকাঠামোর উপাদান। উৎপাদন পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট উপরিকাঠামোর সংযোগে সৃষ্ট হয় সমাজ-সংগঠন। সাধারণত সমাজের উপরিকাঠামো তার মূল কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। মূল কাঠামোর পরিবর্তিত উপরিকাঠামো চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যকে পরিবর্তিত করে। ফলে সমাজ-সংগঠনও পরিবর্তিত হয়। মূল ও উপরিকাঠামোর এ কার্যকারণ সম্পর্ক একটা সার্বজনীন সত্য। কিন্তু মূলকাঠামোর পরিবর্তন উপরিকাঠামোকে তৎক্ষণাৎই রূপান্তরিত করে না। অন্যদিকে উপরিকাঠামোও দ্বা›িদ্ধক পদ্ধতিতে মূল কাঠামোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে।
পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজের মূল কাঠামো পরিবর্তিত হওয়ার পূর্বেই নতুন উপরিকাঠামোর উপাদানসমূহের উন্মেষ হতে থাকে। অর্থাৎ পুরাতন সমাজ-ব্যবস্থায়ই নতুন ভাবাদর্শ জন্মগ্রহণ করতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ অনেক আধা-সামন্ততান্ত্রিক, প্রাক-ধনতান্ত্রিক এবং অনুন্নত ধনতান্ত্রিক সমাজেও সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা ও শক্তিসমূহের আবির্ভাব ঘটতে পারে। এর একটি কারণ এই যে, পুরাতন সমাজ-ব্যবস্থাই সমাজের অগ্রসর শ্রেণীগুলো তাদের ভাবধারা প্রকাশ করে এবং তার মাধ্যমে নতুন সমাজ-ব্যবস্থা প্রবর্তনের সংগ্রাম পরিচালনা করে। এ কথাও সত্য যে, মূল কাঠামোর পরির্বতনের ফলে যে উপরিকাঠামোর সৃষ্টি হয়, তাও একটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। কেননা, উপরিকাঠামো মূল কাঠামোকে আরো দৃঢ় এবং সুনিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করার সহায়ক হয়। উপরিকাঠামোর এ ভূমিকা অত্যন্ত জটিল ও গুর”ত্বপূর্ণ। কেননা পুরনো উপরিকাঠামোর প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী মূল কাঠামো পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিলুপ্ত হয় না। তারা নিজেদের শ্রেণী স্বার্থে পুরাতনকে টিকিয়ে রাখার জন্য মতাদর্শগত সংগ্রাম চালাতে থাকে। উপরিকাঠামোর সামগ্রিক পরিবর্তন একটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। বিবর্তন ও বিকাশের পথে নতুন ও পুরাতন দীর্ঘদিন যাবৎ জড়াজড়ি করে থাকে। নতুন সমাজ-ব্যবস্থায়ও পুরাতন সমাজ-ব্যবস্থার সাংস্কৃতিক অংশবিশেষ সমূহকে নির্মূল করার জন্য নতুন উপরিকাঠামোকে সংগ্রাম করে যেতে হয় বিরামহীনভাবে।

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: