আদিবাসী ও কৃষিভিত্তিক সমাজ (Primitive and Agricultural Society)

আদিবাসী মানুষের ইতিহাসকে প্রস্তরযুগ ও ধাতবযুগ এই দুই ভাগে ভাগ করা হইয়া থাকে। প্রস্তর যুগকে আবার আদিপ্রস্তরযুগ ও নয়া প্রস্তরযুগ এই দুইটি উপভাগে বিভক্ত করা হয়। এসকল যুগের মেয়াদ লইয়া বিজ্ঞানীদেও মধ্যে মত বিরোধ রহিয়াছে। কারণ পৃথিবীর আদিবাসী মানুষের ইতিহাসে সুনির্দিষ্ট কোন সন তারিখের উল্লেখ নাই। আদি প্রস্তর যুগের শেষ ভাগে মানুষ পাথর নির্মিত যে হাতিয়ার ব্যবহার করিত তাহা কুঠার, হাতুড়ি, ছুরি ও খঞ্জরের ন্যায় কাজ করিত।

উক্ত অস্ত্র ছিল মানুষের একমাত্র ও সকল কাজে ব্যবহারপযোগী হাতিয়ার। যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনে মানুষের যে ধীশক্তি আজিকার লেদ, পাঞ্চপ্রেস ও ডায়নামোর যান্ত্রিক যুগে তাহাকে আগাইয়া লইয়া আসিয়াছে, আদি প্রস্তর যুগে উক্ত হাতিয়ার নির্মাণে তাহার সেই ধীশক্তির প্রথম প্রয়োগ ঘটিয়াছিল। সময় যতই অতিবাহিত হইতে থাকে, এই যুগের মানুষের মধ্যে ততই বিভিন্ন ধরণের হাতিয়ার ও যন্ত্রপাতি নির্মাণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এই যুগে মানুষ ছিল শিকারী। সে উদ্দেশ্যে বা বিনা উদ্দেশ্যে ঘুরিয়া বেড়াইত। প্রকৃতির খেয়াল খুশির হাতে সে নিজেকে সঁপিয়া দিত। প্রকৃতির উপর তাহার কোন হাত ছিল না। স্বীয় পারিপার্শ্বিকতার উপর সে প্রভাব খাটাইতে জানিত না। প্রকৃতি তাহার নিকট ছিল চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। খাদ্যের সন্ধানে পশু ও পাখী শিকারের উদ্দেশ্যে সে স্থান হইতে স্থানান্তরে চলিয়া যাইত। মানুষের অতিরিক্ত খাদ্যের যোগান দেওয়ার জন্য গাছ গাছড়ার শিকড়, বাদাম জাতীয় ফল, পাতা ও ফলমূলের তখন অভাব ছিল না। আদি প্রস্তর যুগোত্তর সময়ে বর্তমান মানুষের প্রত্যক্ষ পূর্বসূরী ঈৎড় গধমহড়হ মানবের উদ্ভব ঘটে। হাড় কাপানো শীত তাহাদিগকে প্রায় সময় গুহায় অবস্থান করিতে বাধ্য করিত। নতুন নতুন হাতিয়ার উদ্ভাবনের জন্য তাহার হাতে প্রচুর সময় থাকিত। তাহার হাড় দ্বারা মৃত্তিকা খোদাই করার হাতিয়ার, বল্লম ও বর্শা তৈরী করিত। বর্শা ও অন্যান্য উন্নতমানের অস্ত্র তৈরী করিয়া ঈৎড় গধমহড়হ মানুষ পশু জগতের উপর স্বীয় প্রাধান্য বিস্তার করিল।

মানুষের ধর্মানুভূতির প্রকাশ সর্বপ্রথম এ যুগে ঘটিয়াছিল। আদি প্রস্তর যুগের শেষ ভাগ পর্যন্ত শিল্প কলার অনুভূতির কোন নজীর নাই। তবে আদি প্রস্তর যুগোত্তর সময়ে ঈৎড় গধমহড়হ মানব ভাস্কর্য শিল্প আয়ত্ব করিতে সমর্থ হইয়াছিল। কাদামাটি দ্বারা তাহারা মূর্তি নির্মাণ করিত এবং নিজেদের বসবাসের গুহার প্রাচীরে চিত্র বিচিত্র বস্তুর প্রতিমূর্তি খোদাই করিয়া রাখিত।

ফ্রাঙ্কলিনের মতে আদিবাসী মানুষ সাধারণ হাতিয়ার বানাইতে জানিত। বিভিন্ন ধরণের হাতিয়ার ও অস্ত্র নির্মাণই ছিল মানুষের বৈশিষ্ট্য। একারণে আমরা আদিবাসী মনুষের সমাজেও বহুবিধ হাতিয়ার ও অস্ত্রের ব্যবহার দেখিতে পাই। আদিবাসী মানুষের জীবন ছিল শ্রেণীহীন। উৎপাদনের কৌশল ও আহরিত সম্পদের মালিকানা ছিল যৌথ। তখন ব্যক্তিগত মালিকানা সম্পর্কিত ধারণার উদ্ভব ঘটে নাই। সকলে মিলিয়া খাদ্য সংগ্রহ করিত, সকলে মিলিয়া উপভোগ করিত। সম্পদের অসম বণ্টন ভিত্তিক শ্রেণী বিভাগ ছিলনা বলিয়াই আদিবাসী সমাজে শোষণের পথ ছিলনা। বহু মনীষী ইহাকে আদি সমাজবাদ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন।
আদিবাসী সমাজের অর্থনীতি ঃ
আদি অর্থনীতি বলিতে আমরা আদিবাসী সমাজে উৎপাদন, ভোগ ও বণ্টনের প্রকৃতি বুঝাইয়া থাকি। সচিব স্তরে আদিবাসী সমাজে অর্থনীতিকে বিশ্লেষণ করিলে আমরা বর্তমান অর্থনীতির সহিত উহার পার্থক্য নির্ণয়ক নি¤œবর্ণিত অদ্ভুদ বৈশিষ্ট্যাবলীর সন্ধান পাইব।
১. প্রাকৃতিক শ্রমবিভাগ ঃ
আদিবাসী সমাজে আফ্রিকার মত কোন সুচারু শ্রম বিভাগ ছিল না। আদিবাসী প্রতিটি মানুষ সে যুগে প্রচলিত সকল কাজের কিছু কিছু কৌশল জানিত। তবে বয়সের ভিত্তিতে আদিবাসী সমাজে এক প্রকার শ্রমবিভক্তি ছিল বলিয়া দেখা গিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ শিশুদিগকে কোন কঠিন কাজ করিতে দেওয়া হইত না। উপজাতীয় তরুণ ও শক্তিশালী লোকেরা এই ধরণের কাজগুলি সম্পাদন করিত। গোত্রের নারী ও পুরুষের মধ্যে আবার শ্রম বিভাগের রেওয়াজ ছিল। আদি সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে শ্রমবিভক্তির চিত্র নি¤েœর তালিকায় পাওয়া যাইবে ঃ
পুরুষ    নারী
শিকার, মৎস্য ধরা, কাঠের কাজ, ধাতুর কাজ, আবাস নির্মাণ, গবাদিপশু চারণ, ভারী কাজ, প্রশাসন, ধর্ম ও মাঠ পরিষ্কার করা    শিশুর যতœ, রন্ধন, গৃহস্থালী কর্ম, ঝুড়ি তৈরী, মৃৎপাত্র তৈরী, বস্ত্র বয়ন, শস্যক্ষেত্রে নিড়ের কাজ, বৃক্ষরোপণ, ফাদ পাতিয়া মাছ ধরা, গাছের শিকড় সংগ্রহ, শাকসব্জী সংগ্রহ, বনের ফলমূল সংগ্রহ

ভৌগলিক অবস্থাভেদে শ্রমবিভগের নিয়মও আদিবাসী সমাজে প্রচলিত ছিল। নদী ও হ্রদের তীরে বসবাসকারীরা মৎস্য শিকার করিত, আবার বনাঞ্চলের নিকটে বসবাসকারীরা পশু শিকার ও কাঠের কাজ করিত। এই সমাজে প্রকৃতপক্ষে শ্রমবিভাগের ক্ষেত্রে দক্ষতা যাচাইয়ের বালাই ছিলনা।

আদীবাসীদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অস্তিত্ব বাজায় রাখার অর্থনীতি বলা যায়। এই সমাজে মানুষ তাহাদের অস্তিÍত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনে প্রয়াজনানুপাতিক দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন করিত। জীবন রক্ষার পরিকল্পনায় ন্যূনতম খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও জীবন যাত্রার খুঁটিনাটি প্রয়োজন অন্তর্ভূক্ত থাকিত। এই ব্যবস্থার অগ্রগতি ছিল নম্বর ও তাৎপর্যহীন।

উপঢৌকন দান আদি অর্থনীতির লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলিয়া বিবেচিত হইত। কোন অতিথি কোন সামগ্রী পছন্দ করিলে মেজবান তৎক্ষনাৎ তাহা তাহাকে উপহার দিত। সাথে সাথে হোক বা বিলম্বে হোক উপহার প্রাপ্ত অতিথি উহার প্রতিদান পাঠাইয়া দিতেন; তবে সব সময় প্রতিদানের মূল্য সব সময় উপহারের সমান হইতনা- ইহার অন্যতম মুনাফা শিকারের মনোবৃত্তি তখনও মানুষের আচার প্রথাকে গ্রাস করে নাই। উপহার আদান প্রদানের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পূণর্বন্টনের ইচ্ছা মানুষের থাকিত না তবে সামাজিক সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য হেতু মানুষ সামগ্রী আদান প্রদান করিত। তবে ব্যবসায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পুণর্বন্টনের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হইত। আদিবাসী মানুষের সমাজে দ্রব্যের মানমূল্য ভিত্তিক আদান প্রদানের কোন মাধ্যম ছিল বলিয়া আমাদের জানা নাই। পণ্য বিনিময় পদ্ধতিই বাণিজ্য ও ব্যবসায় ব্যবস্থাকে পরিচালনা করিত।

খাদ্য আহরণ অর্থনীতির প্রকৃতি ঃ
আদিবাসী সমাজে খাদ্য আহরণ অর্থনীতি প্রচলিত ছিল, আদিবাসী মানুষ এই ব্যবস্থার উপর নির্ভর করিয়াই জীবনযাত্রা নির্বাহ করিত। খাদ্য আহরণ অর্থনীতি ভিত্তিক পল্লী ছিল অস্থায়ী প্রকৃতির। তখনও মানুষের বাসগৃহ ছিল একান্ত প্রাথমিক পর্যায়ের; তাহারা বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করিত। তাহাদের বাসগৃহ ছিল নিতান্ত সাদামাটা। উদাহরণস্বরূপ খাদ্য আহরণ অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল এক্সিমো সমাজে নিতান্ত ক্ষুদ্রাকৃতির বাসগৃহ নির্মাণ করিয়া তথায় বসবাস করে। আদিবাসী সমাজে মুষ্টিমেয় লোক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল গঠন করিয়া পরস্পর পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া জীবনযাপন করিত। তাই আমরা দেখিতে পাই সে যুগের বসত বাড়ী ও ঘরবাড়ী ছিল বিচ্ছিন্ন ও অস্থায়ী। সে যুগের লোকদের ব্যবহারের যন্ত্রপাতি ছিল বিচিত্র, সামাজিক আচার প্রথাও সবসময় সহজ ছিল না। সে সমাজে স্থিতিশীল শ্রেণী কাঠামো না থাকিলেও তাহাদের ধর্ম, পারিবারিক সম্পর্ক, আইন ও আচার প্রথা ছিল জটিল। খাদ্য আহরণ অর্থনীতির আওতাধীন বিবিধ কাজ ছিল ঃ শিকার, মৎস্য ধরা ও বন্য ফলফলাদি সংগ্রহ করা।

আদি প্রস্তরযুগের মানুষদের হাতে শিকারের জন্য পাথরের গদা, আনাড়ি হাতের কুঠার, বুমেরাং ধরণের কাঠের নিক্ষেপক লাঠি, শীর্ষভাগে কাঠের সূচালো অংশযুক্ত বর্শা ছাড়া তেমন কোন যন্ত্র ছিল না। প্রস্তর যুগের মাঝামাঝি পর্যায়ে আসিয়া মানুষ পুরোপুরি শিকারী হইয়া উঠে; অবশ্য তখনও হাতিয়ারগুলি ততটা কৌশলপূর্ণ ও কার্যকরী ছিলনা; মোটামুটি ব্যবহারপযোগী এসকল অস্ত্র দ্বারা সবসময় নিজের আহারের জন্য তাহারা পশু বধ করিতে পারিত; নিদেনপক্ষে বড় বা বৃহদাকার প্রাণীর আক্রমণ হইতে রক্ষা পাইবার জন্য এসকল অস্ত্র কাজে লাগানো যাইত। প্রস্তরযুগ অতিক্রম করিয়া মানুষ বহুবিধ নিক্ষেপণ অস্ত্র আবিষ্কার করিয়া বসে। এসময়ে তাহারা বর্শা, হরপুন বর্শা ছোঁড়ার যন্ত্রের ব্যবহার শিখিতে সক্ষম হয়। হরপুন ও বড়শার সন্ধান এবং অতীতের প্রাণীসমূহের দেশাবশেষের মধ্যে মাছের কাঁটার সন্ধান লাভের ফলে একথা সন্দেহাতীত তবে প্রমাণিত হইয়াছে যে, খাদ্য-সংগ্রহ অর্থনীতি যুগে মৎস্য শিকার ছিল খাদ্য লাভের অন্যতম উৎস। পরবর্তী ধাতব যুগে শিকারী হিসাবে মানুষের দক্ষতা আরও বৃদ্ধি পায়। আমরা যদি খাদ্য-সংগ্রহ অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল আজিকার কোন উপজাতির কথা ধরি তবে আমরা দেখিতে পাইব যে, শিকার, মৎস্য-ধরা ও খাদ্য সংগ্রহের জন্য উপরে বর্ণিত ধরণের হাতিয়ার ব্যবহার করিয়া থাকে।

পশু-পক্ষী শিকারঃ
আদিম সমাজগুলো ছিল ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। সামাজিক, ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কার এবং ভৌগলিক অবস্থার তারতম্যের জন্য সব জায়গায় একই প্রকার পশু-পক্ষী শিকার সম্ভব ছিল না। অস্ট্রেলীয় আদিবাসীরা ক্যাংগারু, টিয়েরাডেল্ ফিউগোর ওনা জনগোষ্ঠী উটাকৃতির প্রাণী গুয়ানাকো এবং প্লেইন্স ইন্ডিয়ানরা মহিষ শিকারে বেশি উৎসাহী ও অভ্যস্ত ছিল। বছরের বিশেষ কোন ঋতুতে সারা বছরের জন্য মাংসের যোগাড় করে রাখত। এস্কিমোদের অনেকেই সিল (সাগরীয় স্তন্যপায়ী প্রাণী) এবং শীতে কারিবু শিকার করত। এসব শিকারী সমাজ শিকার অন্বেষণে নানা জায়গায় গিয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করত। তারা যেসব কৌশল ব্যবহার করত তা দেখে মনে হয় না যে এরা বুদ্ধিমত্তায় নিকৃষ্ট ছিল।

ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার চেয়ে দলবদ্ধ প্রচেষ্টা খুবই লাভজনক। ক্যালিফোর্ণিয়ার নিজন্যান জনগোষ্ঠী দলবদ্ধভাবে শিকার কাজ পরিচালনা করত। জাল, ফাঁদ এবং অন্যান্য কৌশল প্রয়োগ করে ছোটখাট পশু-পক্ষী শিকার করার কথা জানা যায়। অনেক আদিম সমাজে শিকারী কুকুর শিকার কাজে  ব্যবহার করা হতো। আমাদের গ্রাম দেশের বিল-ঝিল-বনে আজও বক, ডাহুক ও অন্যান্য পাখি শিকার করতে জাল-ফাঁদ এবং অন্যান্য কৌশল প্রয়োগ করতে দেখা যায়। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো হচ্ছে শিকারী জীবনের ধ্বংসাবশেষ।

মৎস্য শিকার ঃ
মাছের প্রাচুর্য থাকলেই যে আদিম জনগোষ্ঠী তা শিকার ও ভোগ করত এমন নয়। তাসমানীয়রা যদিও শম্বুক জাতীয় কোমলাঙ্গ জন্তু সংগ্রহ ও আহার করে তথাপি মাছ ধরা ও আহার করার ওপর ট্যাবু বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর তীরবর্তী এলাকায় মাছের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে সেখানে শ্যালমন মাছ বেশি পাওয়া যায়। বৃটিশ কলম্বিয়া এবং দক্ষিণ আলাস্কার হায়দা, টিলিনগীট ইত্যাদি জনগোষ্ঠী মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলসমূহের সাধারণ হাতিয়ার দিয়ে শেল মাছ ও শম্বুক সংগ্রহ করা হয়। বিভিন্ন আদিম জনগোষ্ঠী বড়শী, জাল, বাঁশ, বেত, কাঠ নির্মিত যন্ত্রপাতি মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করে আসছে। উৎপাদন অর্থনীতিতেও মৎস্য শিকারের গুরুত্ব কম নয়।

ফলমূল আহরণ ঃ
আদিম সমাজে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম ছিল। বন বনান্তর, ঝোঁপ-ঝাড়, জঙ্গল গাছপালার তেমন অভাব ছিল না। শাকসব্জি, বীজ, ফলমূল, জাম, মটরশুঁটি, বাদাম ইত্যাদি সংগ্রহ করেও মানুষের জীবিকা নির্বাহ সম্ভব হয়েছে। শিকার ও মাছ ধরার সাথে সাথে অনেক আদিম সমাজ বন্য ফলমূলও সংগ্রহ করে নিত। খদ্য আহরণ কৌশল নির্ভর করত ভৌগলিক অবস্থার তারতম্যের ওপর। আফ্রিকার গভীর অরণ্য অঞ্চলে সব্জি নেই। ওখানকার বুশম্যান জনগোষ্ঠী ছাড়া কোন আফ্রিকান ট্রাইবকে খাদ্য আহরণকারী বলে আখ্যা দেওয়া যায় না। এশীয় বনভূমি বাসিন্দা, বিশেষ করে মালয় উপদ্বীপবাসীরা প্রচুর ফলমূল আহরণ করে থাকে। খাদ্য আহরণ কৌশলে হাত-ই বড় হাতিয়ার। এ সঙ্গে কিছু সাধারণ কলাকৌশল ব্যবহার করা হতো। খাদ্য সংগ্রহ অর্থনীতি (আহরণ-শিকার-মাছ ধরা) মর্গান বর্ণিত বন্যদশার নি¤œ, মধ্য ও উচ্চ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে।

খাদ্য আহরণ অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য ঃ
১।    খাদ্য-সংগ্রহ অর্থনীতি ভিত্তিক জনসমাজে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল নিতান্ত অনুল্লেখযোগ্য। সম্প্রদায় বা সমাজ ছিল আকারে ক্ষুদ্র, এগুলি ৪০ বা ৫০ জন ব্যক্তির ততোধিক ক্ষুদ্রাকৃতি উপদলে বিভক্ত থাকিত।
২।     খাদ্য সংগ্রহকারী সমাজ বা দলগুলি বনজ উদ্ভিদ বা পশুর সন্ধানে মাঝে মাঝে বা অব্যাহত ভাবে একস্থান হইতে অন্যস্থানে ঘুরিয়া বেড়াইত। তাহাদের প্রকৃতি ছিল অনেকটা বেদুঈন প্রকৃতির।
৩।    স্বনির্ভরশীল পরিবার ভিত্তিক দল অথবা তুলনামূলক শিথিল সম্পর্কে আবদ্ধ পরিবার সমষ্টি দলবদ্ধ ভাবে খাদ্য সংগ্রহের কাজে নামিয়া পড়িত। তাই রাজনৈতিক সংগঠনের চাইতে আত্মীয়তা দ্বারাই তাহাদের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক একাত্মবোধ প্রভাবিত হইত বেশী।
৪।    আজও খাদ্য আহরণের উপর নির্ভর করিয়া জীবনযাত্রা নির্বাহকারী দলগুলিকে অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর ও শক্তিশালী খাদ্য উৎপাদক শ্রেণীর তাড়া খাইয়া অন্যত্র বা দূরবর্তী অঞ্চলের দিকে সরিয়া যাইতে দেখা যায় তাই বিশ্বের খাদ্য সংগ্রহকারী সমাজ গুলিকে বিবর্তন ও পরিবর্তনের প্রতি উদাসীন বলিয়া দেখা গিয়োছে। একই কারণে তাহাদিগকে দুষ্পরিবর্তনীয় সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা আকড়াইয়া পড়িয়া থাকিতে দেখা যায়। তাহাদের এই বিশেষ জীবনধারা আজও বিশ্বের বুক হইতে মুছিয়া যায় নাই।
৫।     খাদ্য সংগ্রহকারী মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক শ্রমবিভাগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষরা সাধারণতঃ মৎস্য, পশু শিকার, ইত্যাদি ধরণের কঠিন কাজগুলি সম্পন্ন করিত, অপরপক্ষে নারীরা বনজ ফলমূল এবং বৃক্ষচারা ও লতাপাতা সংগ্রহ করিত।
৬।     শিকার ও মৎস্য ক্ষেত্রের ন্যায় প্রধান খাদ্য সরবরাহ উৎস অথবা খাদ্য সরবরাহের উপর ব্যক্তির মালিকানা ও অধিকার তখনও ছিল সীমিত।
৭।     কুকুর ব্যতীত তখন কোন পশুকেই মনুষ পোষ মানাইতে শিখে নাই।
৮।     জীবন রক্ষার তাগিদে তাহারা খাদ্য সংগ্রহ করিয়া ভোগ করিত বটে তবে খাদ্য সংরক্ষণের কৌশল তাহাদের জানা ছিল না। ব্যবসা ও বাণিজ্যের মনোবৃত্তি না থাকায় খাদ্য সংগ্রহের জন্য কাহাকেও খুব একটা খাটিতে দেখা যাইত না। অপরদিকে সম্পর্ক ও সম্পত্তির উপর ব্যক্তির স্বীয় মালিকানা সম্পর্কিত ধারণা ব্যক্তি লাভ না করায় সমাজের লোকদের মধ্যে সম্পদের মালিকানাগত ব্যবধান পরিলক্ষিত হয় নাই। শিকারের ক্ষেত্রেই পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল সবচাইতে বেশি। আদিবাসী মানুষের জীবন নির্বাহের অন্যতম উপায় ছিল শিকার; খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তাই কোন প্রকার ভূমির মালিকানার প্রয়োজন হইতনা; মালিকানা সম্পর্কিত অস্পষ্ট ধারণাটি ছিল বড়জোর যৌথ মালিকানার শামিল। জীবনের মৌল চাহিদা পূরণের ব্যাপারে তখন সকল উৎপাদিকা শক্তিকে উৎসাহ দান করা হইত, ফলে প্রাথমিক স্তরে উৎপাদন ব্যবহার যৌথ মালিকানা উৎপাদিকা শক্তির দ্বারাই নির্ধারণ করা হইত।

আদি সমাজে সামাজিক সংগঠন ঃ
আপাতঃ দৃষ্টিতে আদিবাসীদের সমাজে সমাজ ব্যবস্থার সংগঠন প্রকৃতি সহজ বলিয়া অনুমিত হইতে পারে। তবে বিশ্লেষণ করিয়া দেখিলে আমরা দেখিতে পাইব যে, আদি সমাজের গঠন প্রকৃতি ছিল বেশ দুরূহ ও জটিল। আজিকার মনুষ্য সমাজের মতই সে যুগেও সামাজিক আচার, জটিল প্রথারত ও নিয়ম-কানুন সেকালের মানুষের অভ্যাস, আচরণ ও কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রণ করিত। তাহাদের আচার আচরণের একটি সুনির্দিষ্ট ধারা বিদ্যমান ছিল। এই আচরণ বিধি সাধারণতঃ পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব, পিতামাতার সহিত সন্তানের সম্পর্ক, সন্তানের প্রতি ¯েœহ মমতা প্রভৃতি নির্ধারণ করিত। কার্যাদি সম্পাদনের ক্ষেত্রেও কতিপয় নিয়ম কানুন মানিয়া চলিতে হইত এবং দেবদেবীর অর্চনাকালে তাহারা বিভিন্ন ব্রত ও মন্ত্র পাঠ করিত; বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠান পালনের জন্যও বিভিন্ন প্রথা ও নিয়মকানুন নির্দিষ্ট ছিল।

সমাজে পারিবারিক জীবন ঃ
আদিবাসীদের সমাজে ছিল সমগ্র সমাজের মৌলিক ও অপরিহার্য উপাদান। পরিবার গঠনের রীতিও ছিল বিভিন্ন। এক স্ত্রী বিশিষ্ট বা বহু স্ত্রী বিশিষ্ট পরিবার তখনকার সমাজে প্রচলিত ছিল। একজন স্ত্রী লইয়া একজন স্বামী সংসার গড়িয়া তুলিত, বহু স্ত্রী, বিশিষ্ট পরিবারে একজন পুরুষ একাধিক স্ত্রী লইয়া সংসার পাতিত। অপরপক্ষে বহু স্বামী বিশিষ্ট পরিবারে একজন নারী একাধিক পুরুষকে লইয়া ঘর বাঁধিত। কয়েকজন ভ্রাতা যদি একটি নারীকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করিয়া সংসার গড়িত সেক্ষেত্রে পরিবারকে পৈত্রতান্ত্রিক পরিবার বলা হইত। উদাহরণস্বরূপ দক্ষিণ ভারতের নীলগিরি পাহাড়িয়া অঞ্চলে টোডা উপজাতির মধ্যে পিতৃতান্ত্রিক বহুস্বামী বিশিষ্ট পরিবারের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়।

আদি সমাজে স্ত্রীরা স্বামীদের মত ছিলনা। উপজাতীর আচার প্রথা স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার নির্দিষ্ট করিয়া দিত। তবে পুরুষরা নিজেদের শরীরিক শক্তি এবং লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবণ্টন সত্ত্বেও সমাজের কর্যক্রমে নিজেদের বলিষ্ঠ ও ব্যাপক ভূমিকার কথা ভাবিয়া নিজদিগকে নারী অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী বলিয়া ধারণা দিত।

সামাজিক আচার, প্রথা ও বিধান দ্বারা স্বামী ও স্ত্রীর অর্থনৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারিত হইত। স্ত্রী সাধারণ গৃহস্থালী কাজকর্মে ব্যস্ত থাকিত। শিকার, মৎস্য ধরা, পাথরের টুকরা দ্বারা অস্ত্র তৈরী, শিকারকে বহিয়া বাসস্থানে লইয়া আসার মত কঠিন কাজগুলি পুরুষরা সম্পাদন করিত।

শিশুদিগকে তখন সাধারণতঃ রূঢ় পরিস্থিতিতে ফেলা হইতনা, তবে কোন কোন সময় নিতান্ত কম বয়স্ক বালক বালিকাদিগকে তাহাদের শক্তি সামর্থ্যরে তুলনায় কঠিক কাজে লাগানো হইত। আদিবাসী মানুষের মধ্যে সম্প্রসারিত পরিবার ধরণের গোত্র পরিলক্ষিত হইত। এই গোত্র বলিতে পারস্পরিক সম্পর্কে আবদ্ধ একদল মানুষকে বুঝানো হইত। তাহারা সাধারণতঃ তাহাদের মাতার সূত্র ধরিয়া আত্মীয়তার সন্ধান করিত। এ ধরণের সমাজে পরিবারের শিশুরা মামাকে পিতা বলিয়া সম্বোধন করিত।

পুত্র ও কন্যারা পরস্পরকে ভ্রাতা ভগ্নি বলিয়া জনিত। সম্প্রসারিত পারিবারিক গোত্রের লোকদের বন্ধনসূত্র ছিল সহানুভ’তি ও অসহায়ত্ব। উপজাতীয় লোকদের  মধ্যে ভ্রাতা ও ভগ্নির মধ্যকার সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের চাইতেও ঘনিষ্ঠ ছিল। প্রয়োজনে বিবাহিতা ভগ্নি ভ্রাতার সাহায্য কামনা করিত।

দল ও উপজাতি ঃ
দল ছিল আদি ক্ষুদ্রতম সামাজিক সংঘ। একই বংশোদ্ভুত, একই রক্ত ও আত্মার উত্তরাধিকারী বলিয়া যাহারা নিজদিগকে মনে করিত তাহারাই শেষাবধি দল গঠন করিত। দলের সদস্যদের কাহারো প্রতি কেহ কোন অন্যায় করিলে তাহারা উহার প্রতিশোধ লইত। বাধা বিপত্তি ও অসুবিধা দূরীকরণার্থে তাহারা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করিতে প্রস্তুত থাকিত। আদিবাসী সমাজে নিকট আত্মীয় ও আত্মীয়ার মধ্যে বিবাহ সাধারণতঃ নিষিদ্ধ ছিল। তবে সময় সময় আদিসমাজে একই দলের অভ্যন্তরেই বিবাহের প্রয়োজন হইয়া পড়িত। গোষ্ঠী বা দলগুলি কোন বিশেষ প্রতীক দ্বারা পরিচিত হইত।  অবশ্য সকল আদিবাসী মানুষের মধ্যে এসকল প্রথা চালু ছিল না। বিশ্বের কয়েকটি দেশের কিছু কিছু প্রাচীন গোষ্ঠীর মধ্যে এসকল প্রথার প্রচলন দেখা গিয়াছে।

আদি সরকার ও আইন পদ্ধতি ঃ
আদি সমাজে উপজাতি ভেদে সরকার পদ্ধতির পার্থক্য পরিলক্ষিত হইত। শিকারী দল সংগঠনের প্রয়োজনে কঠোর নেতৃত্বাধীন গঠিত সামান্য রাজনৈতিক সচেতনতা, লইয়া আন্দামান দ্বীপের প্রাচীন অধিবাসীরা সমাজ গঠন পূর্বক বসবাস করিত বলিয়া জানা গিয়াছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপসমূহে রাজত্ব, সাধারণ মানুষ ও দাস সমবায়ে গঠিত কেন্দ্রীয় সরকার প্রকৃতির সংগঠন পরিলক্ষিত হয়। অস্ট্রেলিয়ার কতিপয় উপজাতির মধ্যে বয়স্ক ও প্রবীণ ব্যক্তিদের পরিষদ ছিল, এসকল পরিষদ উপজাতির রাজনৈতিক প্রশ্নাদির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহন করিত। আফ্রিকার উপজাতি সমূহের মধ্যে একজন উপজাতীয় প্রধানকে লইয়া সরকার গঠিত হইত। সরদার বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ ব্যক্তিদের মতামত লইয়া শাসন পরিচালনা করিতেন। উপজাতি ভেদে সরকারের কাঠামো ও পদ্ধতি ছিল বিভিন্ন তবে বিশ্বের প্রায় সকল দেশে সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে রাজনৈতিক একগুয়েমী সাধারণভাবেই অনুপস্থিত ছিল। সরদার তাহার উপজাতির অনানুষ্ঠানিক আইন ও প্রথা অনুযায়ী শাসন চালাইত। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে সরদারকে অবশ্যই প্রবীণ পরিষদের সম্মতি লইতে হইত।

সমাজকে ছত্রছায়া দান এবং দুষ্কৃতিকারী অপরাধীদের শাস্তি প্রদানপূর্বক লোকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ ছিল আদিবাসী সমাজের আইনের প্রকৃতি। উপজাতীয় লোকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা সাধারণ বা কঠোর হইতে পারিত। সরদারও প্রবীণ উপজাতীয় লোকেরা সাধারণতঃ শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করিয়া দিতেন। উপজাতীয় সমাজে সমগ্র উপজাতির সমষ্টিগত ক্ষতির কারণ বলিয়া বিবেচিত বিভিন্ন কার্যকলাপকে অপরাধ বলিয়া গণ্য করা হইত এবং উপজাতীয় সর্দার তজ্জন্য শাস্তি দানের ব্যবস্থা করিতেন। বিশ্বাসঘাতকতা, ইন্দ্রজাল ইত্যাদি ছিল ঐ ধরণের অপরাধের প্রকৃতি। ক্ষতিপূরণ দ্বারা এসকল কার্যের শাস্তি বিধান করা সম্ভব হইতনা বলিয়া আইনের বিধান অনুযায়ী শাসন কর্তৃপক্ষ শাস্তি দানের ব্যবস্থা করিতেন। সাধারণ ভাবে মৃত্যুদ-ই ছিল এধরণের শাস্তি। তখন ধারণা করা হইত যে, অব্যাহত ভাবে সামাজিক অপরাধে প্রবৃত্ত ব্যক্তিরা গোত্রীয় পূর্ব পুরুষের প্রেতাত্মার শিকারে পরিণত হইয়াছে। আদিবাসী সমাজে কেহ কোন অপরাধ করিলে আত্মীয় স্বজনকে তাহার সংশোধনের দায়িত্ব গ্রহণ করিতে হইত। গোষ্ঠীর কোন সদস্য নিয়মিত আইনভঙ্গ করিতে থাকিলে তাহাকে গোষ্ঠী হইতে বহিষ্কার করা হইত এবং কোন কোন সময় তাহাকে হত্যা করা হইত। সমাজচ্যুত করা ছিল আদি সমাজ ব্যবস্থার খুঁটিনাটি অপরাধের জন্য অন্যতম শাস্তি।

আদি সমাজে ধর্ম ঃ
আদিবাসী সমাজে লোকদের উপর ধর্মের প্রভাব ছিল অসীম। ধর্মীয় ভাবধারা, জ্ঞান ও বিধিবিধান দ্বারা আদিবাসী মানুষের জীবন যাত্রা পরিচালিত হইত। জন্ম মৃত্যু পর্যন্ত আদিবাসী মানুষের জীবনধারায় ধর্মের বন্ধন কখনো শিথিল হইত না। এ. এম. টেলরের মতে, সন্তানের জন্ম, বৃষ্টিপাত, উপজাতির পত্তন, ফসল বুনন ও ফসল কাটা, বিবাহ, মৃত্যু, যুদ্ধ-জীবনের সকল ক্ষেত্রে ধর্মের প্রভাবের কথা চিন্তা করা হইত।

বজ্রপাত, বিদ্যুত চমকানো, ব্যাধি জরা ও মৃত্যুর মত ব্যাখ্যাতীত বিষয়গুলি লইয়া আদিযুগের মানুষকে অসহায়ত্ববোধ করিতে দেখা যাইত। মানব জীবন ধারা পরিচালনাকরী ভয় ও শ্রদ্ধার পাত্র রহস্যাবৃত প্রহেলিকাময় শক্তিরসহিত যোগসম্পর্ক স্থাপনের প্রেরণা ধর্মের জন্ম দেয় এবং ইহাকে কেন্দ্র করিয়াই ধর্ম বিস্তার লাভ করে। ধর্মের প্রাথমিক উৎপত্তি ও প্রসারের প্রথম স্তরকে উদ্বুদ্ধতা বলা হইত, মিথ্যা অপ্রকৃত মহাশক্তি স্তুতিই ছিল অনুরূপ ধর্ম বিশ্বাসের বৈশিষ্ট্য। ধর্মের দ্বিতীয় স্তরকে বলা হয় জড়ড়স্তুতি- এ পর্যায়ে অসত্য আধ্যাত্মশক্তি ও বিশ্বাসকে সুনির্দিষ্ট ভাবধারায় বিচার করিয়া কতিপয় অংশকে সত্য, কতিপয় অংশকে অসত্য বলিয়া মানিয়া নেওয়া হয়।

আদি ধর্ম ও যাদুবিদ্যার মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। প্রকৃতি ও কালকে নিয়ন্ত্রণের জন্য অতি পাকৃত শক্তির সাহায্য গ্রহণ করিয়া যাদুবিদ্যা সাফল্য লাভ করিত। আদিবাসী লোকেরা ডাইনীতে বিশ্বাস করিত এবং ভাবিত যে, ডাইনীরা মানুষের ক্ষতি করিতে পারে

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: