অর্থ money

অর্থ

প্রাচীনকালে মানুষের অভাব ও প্রয়োজন ছিল সীমিত। কিন্তু কালক্রমে মানুষের অভাব বহুগুণে বেড়ে গেল। ফলে তার পক্ষে প্রয়োজনীয় সব দ্রব্য ও সেবা উৎপাদন করা সম্ভব হত না। মানুষ তার নিজের উৎপাদিত দ্রব্যের বিনিময়ে অন্যের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দ্রব্য গ্রহণ করে অভাব পূরণ করতে লাগল। অভাব পূরণের জন্য দ্রব্যের সাথে দ্রব্যের এর ধরণের সরাসরি বিনিময় অর্থনীতিতে ‘বিনিময় প্রথা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করল। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের অভাব বহগুগণ বেড়ে গেল, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের পরিধি বৃদ্ধি পেল, তখন বিনিময় প্রথার স্থলে বিনিময়ের এমন এক সাধারণ মাধ্যম প্রচলনের প্রয়োজন দেখা দিল যা দ্রব্যসামগ্রী ও সেবার লেনদেন সহজ, সরল, গতিশীল ও নিরাপদ করে। বিনিময়ের এ সাধারণ মাধ্যমই অর্থনীতিতে মুদ্র বা অর্থ হিসেবে পরিচিত।

 অর্থের সংজ্ঞাঃ
অর্থ বিনিময়ের সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম। যে কোন জিনিস যা বিনিময়ের সাধারণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় তাই অর্থ। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ অর্থকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিম্নে তাদের সংজ্ঞাগুলো দেয়া হল-

জি. ডি এইচ কোল বলেন, “অর্থ এমন একটা জিনিস যা দেনা পাওনা মেটাতে রীতি অনুযায়ী ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এবং ঋণ পরিশোধে সাধারণভাবে গৃহীত হয়।”
ডি. এইচ. রবার্টসনের মতে, “দ্রব্যের মূল্য পরিশোধ অথবা অন্য কোন কার্যকলাপ করতে গিয়ে যা সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য হয় তাই অর্থ।”
আর. পি. কেন্ট বলেন, “অর্থ এমন একটি জিনিস যা বিনিময়ের মাধ্যম বা মূল্যের মান হিসেবে সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়।”
অর্থনীতিবিদ জি. ক্রাউথার বলেন, “অর্থ এমন একটা জিনিস যা বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে সর্বজনগ্রাহ্য এবং যা দ্রব্য বা সেবাকর্মের মূল্যের পরিমাপ হিসেবে এবং সঞ্চয়ের ভান্ডার হিসেবে কাজ করে।”

পরিশেষে বলা যায় যে, যে বস্তু বিনিময়ের মাধ্যম, ঋণগ্রহণ ও পরিশোধের উপায়, মূল্যের পরিমাপক ও সঞ্চয়ের বাহন হিসেবে সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত ও সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য তাকেই অর্থ বলা যায়।

 অর্থের কার্যাবলী ঃ
অতীতে দ্রব্য বিনিময় প্রথা চালু ছিল। পরবর্তী সময় মুদ্রা দ্রব্য বিনিময় প্রথার অবসান ঘটায়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অর্থনীতিবিদরা মুদ্রার কার্যাবলীকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করেন।

অর্থনীতিবিদ ওয়াকার বলেন, “অর্থের পরিচয় তার কাজে।” অর্থের কাজ প্রসঙ্গে প্রচলিত আছে- “গড়হবু রং ধ সধঃঃবৎ ড়ভ ভঁহপঃরড়হং ভড়ঁৎ.”

অ সবফরঁস, ধ সবধংঁৎব, ধ ংঃধহফধৎফ, ধ ংঃড়ৎব. অর্থাৎ মুদ্রা অর্থ, বিনিময়ের মাধ্যম, মূল্যের পরিমাপক, স্থগিত লেনদেনের মান ও সঞ্চয়ের বাহন হিসাবে কাজ করে।

আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থ হলো একটা অপরিহার্য উপাদান। দ্রব্য বিনিময় প্রথার অসুবিধাগুলো দূর করার লক্ষ্যে অর্থের উদ্ভব হলেও বর্তমানকালে অর্থ বিভিন্œ গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে। অর্থের প্রধান কার্যাবলী নিচে আলোচনা করা হলোঃ

১. বিনিময়ের মাধ্যম ঃ
অর্থের প্রাথমিক ও প্রধান কাজ হল- বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে লেনদেন সম্পন্ন করা। বিনিময়ের সর্বজনগ্রাহ্য মাধ্যম হওয়ায় অর্থ দ্বারা যে-কোন সময়ে যে-কোন পরিমাণ পণ্য ও সেবা ক্রয়-বিক্রয় করা যায়। ফলে দ্রব্য ও সেবার লেনদেন সহজ ও গতিশীল হয়।

২. সঞ্চয়ের বাহন ঃ
অর্থ দ্বারা সবকিছু বিক্রয় করা যায় বলে সেসব দ্রব্যসামগ্রী বা সেবার মূল্য অর্থের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা সম্ভব। তাই দ্রব্য সঞ্চয়ের পরিবর্তে তার মূল্য হিসেবে অর্থ সঞ্চয় করা বেশ সুবিধাজনক। অর্থের মাধ্যমে সঞ্চয় করার ফলে অর্থের ক্রয়ক্ষমতাকে বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে ব্যবহার করা যায়। সঞ্চয়ের বাহন হিসেবে কাজ করে অর্থ পুঁজি গঠনেও সহায়তা করে।

৩. মূল্যের পরিমাপক ঃ
কোন দ্রব্যের মূল্যের পরিমাপক বা হিসাবের একক হিসাবে মুদ্রা কাজ করে। অর্থনীতিতে যাবতীয় রকমের লেনদেনের উত্তম মাধ্যম হল মুদ্রা। অর্থনীতিতে দৈনন্দিন বিভিন্ন অর্থনৈতিক কাজ কর্ম, বিভিন্ন পণ্যের মূল্য, ব্যয়, আয় ইত্যাদি পরিমাপের জন্য একটি সাধারণ পরিমাপক দরকার। মুদ্রা সেই সাধারণ পরিমাপকের ভূমিকা পালন করে।

৪. স্থগিত লেনদেনের মান ঃ
অর্থ স্থাগিত লেনদেন বা ঋণ পরিশোধের উপায় হিসেবে কাজ করে। অর্থ ব্যবহারের ফলে দ্রব্যের মাধ্যমে ঋণ প্রদান ও পরিশোধের প্রয়োজন পড়ে না। ঋণদাতা অর্থের অঙ্কে ঋণ দেয় এবং ঋণগ্রহীতা অর্থের অঙ্কে তা পরিশোধ করে। অর্থের মূল্য স্বল্পকালে খুব বেশি পরিবর্তিত হয় না বলে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ঋণদাতা ও ঋনগ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা তেমন থাকে না। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নির্বিঘেœ চলতে থাকে।

৫. মূল্য স্থানান্তরের বাহন ঃ
অনেক দ্রব্য সামগ্রী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সহজে ও নিরাপদে স্থানান্তর করা যায় না। কিন্তু অর্থের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয় করে তার মূল্য সহজে দূরে স্থানান্তর করা যায়। এভাবে মূল্য স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থ সম্পদ ব্যবহার ও আর্থিক লেনদেনে সাহায্য করে।

এছাড়াও অর্থের আরো অনেক কার্যাবলী রয়েছে। সেগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ

৬. ঋণের ভিত্তি ঃ
বর্তমান কালে ব্যবসায়িক লেনদেনের অধিকাংশ বিভিন্ন ধরনের ঋণপত্র, যেমন- চেক, ব্যাংকড্রাফট, বিনিময় বিল প্রভৃতির সাহায্যে সম্পন্ন হয়। ব্যাংকে রক্ষিত নগদ অর্থের আমানতের ভিত্তিতেই এসব ঋণপত্রের প্রচলন হয়। অর্থ তাই ঋণপত্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
৭. তারল্যের মান ঃ
অর্থের সাহায্যে যে কোন দ্রব্য যে কোন সময়ে ক্রয়-বিক্রয় করা যায়। অর্থাৎ অর্থ সবচেয়ে তরল সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থের এ তারল্য গুণের জন্য দ্রব্যসামগ্রীকে যেমন সহজেই অর্থে রূপান্তর করা যায়, তেমনি অর্থকেও দ্রব্যসামগ্রীতে রূপান্তর করা যায়।

৮. তৃপ্তি বৃদ্ধি করার উপায় ঃ
ভোক্তার প্রধান লক্ষ্য হলো সীমিত আয়ের মধ্যে থেকে দ্রব্যসামগ্রী ক্রয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ তৃপ্তি লাভ করা। এ উদ্দেশ্যে ভোক্তা এমনভাবে অর্থ ব্যয় করে যাতে দ্রব্যের দাম তার প্রান্তিক উপযোগের সমান হয়। তাছাড়া ভোক্তা অর্থের মাধ্যমে নিজের ইচ্ছা ও প্রয়োজন মাফিক দ্রব্যাদি ক্রয় করতে পারে। এভাবে অর্থের ব্যবহারের ফলে ভোক্তার তৃপ্তি সর্বাধিক হওয়ার সুযোগ থাকে। উপরন্তু অর্থের মূল্যের বিভাজ্যতার কারণে ভোক্তা তার অর্থ বিভিন্ন পরিমাণে বিভিন্ন দ্রব্যের ওপর ব্যয় করে তৃপ্তি বাড়াতে পারে।

৯. জাতীয় আয়ের বণ্টন ঃ
দেশের মোট জাতীয় আয়ের স্বাভাবিক প্রবাহের কারণে উৎপাদনে অংশগ্রহণকারী উপকরণগুলোর মধ্যে বণ্টিত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে জাতীয় উৎপাদনের আর্থিক মূল্যই অর্থরূপে বণ্টিত হয়।

১০. সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা ঃ
সামাজিক অনুষ্ঠান ও উৎসবের ক্ষেত্রে উপহার উপঢৌকন প্রদানে অর্থ ব্যবহৃত হয়। কেবল অর্থ প্রদান করেই অনেক সামাজিক দায়-দায়িত্ব পালন করা যায়। অর্থের এরূপ কাজের দ্বারা সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশ ঘটে।

১১. মনস্তাত্ত্বিক কার্যাবলী ঃ
অর্থ তার বিভিন্নমুখী ব্যবহার ও উপযোগ দ্বারা ব্যক্তিজীবনে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সৃষ্টি করে। নগদ অর্থের সঞ্চয় মানুষকে অনেক সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে এবং তাকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখে। এর ফলে সমাজে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবোধ বাড়ে এবং বস্তুগত প্রগতি ত্বরান্বিত হয়।

 অর্থের কুফল ঃ
আধুনিক সমাজে অর্থ প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করলেও অর্থ প্রচলনের ফলে সমাজে কিছু কিছু অসুবিধাও সৃষ্টি হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় অর্থ বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কুফল ডেকে আনে। অর্থনীতিবিদ রবার্টসন যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, মনুষ্য সমাজের জন্য অর্থ অনেক কল্যাণের উৎস হলেও নিয়ন্ত্রণবিহীন অবস্থায় তা অনেক অনর্থ ও কুফলের জন্ম দেয়। নিম্নে অর্থের কুফল সমূহ আলোচনা করা হলোঃ
১. অর্থ ভালো সেবক কিন্তু ক্ষতিকর প্রভু ঃ
সাধারণভাবে আমরা দেখেতে পাই যে, ধনীক শ্রেণী গরীবদের উপর অত্যাচারী হয়ে থাকে। অন্যদিকে গরীব শ্রেণী তাদের শোষকদের আদেশ মেনে চলতে বাধ্য থাকে। এক্ষেত্রে অর্থের প্রাচুর্যের কারণে ধনীক শ্রেণী যেমন অত্যাচারী হয়ে ওঠে তেমনি গরীব শ্রেণী অর্থাভাবে আজ্ঞাবহ হয়ে থাকে।

২. অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ঃ
অর্থের অতিরিক্ত যোগান হলে ইহা ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি জন্ম দেয়। প্রয়োজনের তুলনায় অর্থের যোগান কম হলে মুদ্রা সংকোচন সৃষ্টি হয়।

৩. অর্থনৈতিক অসমতা ঃ
অর্থ মানব সমাজকে বিভ্ন্নি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছে। অর্থ প্রচলনের ফলে সমাজে ধনী ও দরিদ্র শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে। অর্থ থাকার দরুণই এক শ্রেণীর লোক ধনী হয়েছে এবং আর এক শ্রেণীর লোক তার অভাবে দরিদ্র হয়ে পড়েছে। সুতরাং অর্থই সমাজের শ্রেণী বৈষম্য সৃষ্টির জন্য প্রধানত দায়ী।

৪. নৈতিক অধঃপতন ঃ
আধুনিক সমাজে অর্থ প্রায় সমস্ত কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। অর্থের কারণেই মানুষের নৈতিক অধঃপতন ঘটেছে। যার ফলে মানুষ দরিদ্রবঞ্চিতদের সাহায্য সহযোগীতা করে অবলীলায় মদ জুয়া ও বিলাসবহুল জীবনকে বেছে নিয়েছে।

৫. আত্মঘাতী অস্ত্র ঃ
অর্থই সকল প্রকার অনর্থের মূল। অর্থ নানা ধরণের সামাজিক অপরাধের জন্য দায়ী। অর্থের লোভে মানুষ নানা ধরণের অপরাধ সংঘটিত করে। এমনকি অনেক সময় অর্থই মানুষের জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৬. সম্পদের অসম বণ্টন ঃ
অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থের যোগান এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থ থাকলে উভয় কারণেই আয় ও সম্পদের অসম বণ্ট সৃষ্টি হয়।

৭. শ্রেণী দ্বন্দ্ব ও সংগ্রাম ঃ
সমস্পদের অসম বণ্টনের তথা পুঁজিপতি কর্তৃক শ্রমিক শোষণের মাধ্যমে দেশে মুষ্টিমেয় ব্যতিত অন্যান্যরা বিত্তহীন হবে। সর্বহারা শ্রেণীর সৃষ্টি হবে। পুঁজিপতি এবং সর্বহারাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বিরাজ করবে।

৮. সামাজিক তিক্ততা ও অস্থিতিশীলতা ঃ
মানুষ তার নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য অর্থ বিভিন্নভাবে অপপ্রয়োগ করে। এতে করে সামাজিক সম্পর্কে তিক্ত এবং অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়।

৯. অর্থের দাপট ঃ
অর্থের আধিপত্যের কারণে সমাজে বিত্তবানরা বিত্তহীন, দরিদ্র শ্রেণীর উপর বিভিন্ন ধরণের জোড় পূর্বক প্রভাব খাটিয়ে থাকে। অর্থের দাপট দেখিয়ে বিত্তবানরা সমাজে আধিপত্য বিস্তার করে।

পরিশেষে বলা যায় যে, অর্থ সর্বদাই আমাদের জন্য আশীর্বাদ নয়। অর্থ সমাজে অনেক সমস্যা সৃষ্টির জন্য দায়ী। এজন্য যথার্থই বলা হয় যে, “অর্থ প্রচলনের ফলে দ্রব্য বিনিময় প্রথার অসুবিধাসমূহ দূর হয়েছে; কিন্তু তা অনেক মানুষ নতুন অসুবিধারও সৃষ্টি করেছে।”

 অর্থ কিভাবে পুঁজিতে রূপান্তরিত হয় ঃ
মার্কস তার ‘ঈধঢ়রঃধষ’ গ্রন্থে পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রণালীর ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর আলোচনার মূল বিষয় ছিল পুঁজি ও উদ্বৃত্ত মূল্য।
পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে অর্থ পুঁজিতে রূপান্তরিত হয় এবং পুঁজিপতিরা সমগ্র শ্রমিক সমাজকে শোষণের মাধ্যমে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। অর্থ কিভাবে পুঁজিতে রূপান্তরিত হয় তা নিম্নরূপ ঃ

পণ্য উৎপাদন প্রথার বিকাশের একটি স্তরে মুদ্রা পুঁজিতে রূপান্তরিত হয়। পণ্য সঞ্চালনের সাধারণ সূত্রটি হলঃ প (পণ্য) – মু (মুদ্রা) – প (পণ্য) অর্থাৎ একটি পণ্য ক্রয়ের জন্য অন্য পণ্য বিক্রয়। কিন্তু পুঁজির সাধারণ সূত্রটি এর বিপরীত। অর্থাৎ মু (মুদ্রা) – প (পণ্য) – মু (মুদ্রা)। অর্থাৎ (মুনাফা সহ) বিক্রয়ের জন্য ক্রয়।

সরল পণ্য সঞ্চালনের ক্ষেত্রে এক পণ্যের সাথে অন্য পণ্যের বিনিময় হয়। অর্থ কেবল বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে কাজ করে। এখানে বিনিময়ের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। ধরা যাক, মুচি জুতার বিনিময় করে রুটির সাথে। পণ্য উৎপাদক তার পণ্য হস্তান্তর করে, যে পণ্যের প্রয়োজন তার নেই। বিনিময়ে অন্য একটি পণ্য গ্রহণ করে, যে পণ্যের তার প্রয়োজন আছে। এতে অর্থ পুঁজিতে রূপান্তরিত হতে পারে না।

অপরদিকে পুঁজি সঞ্চালনের সূত্রটি হচ্ছে পুরোপুরিভাবে ভিন্ন চরিত্রের। পুঁজিপতি নির্দিষ্ট পরিমাণ মুদ্রা নিয়ে বাজারে যায়। এখানে সূচনাবিন্দু পণ্য নয়, বরং মুদ্রা। ঐ মুদ্রা দিয়ে পণ্য ক্রয় করে। এরপর পণ্যটির গুণগত মানের পরিবর্তন করে বিক্রয়ের মাধ্যমে আবার পুঁজির সৃষ্টি করে। অর্থাৎ পুঁজি বিচলনের সূচনাবিন্দু ও সমাপ্ত বিন্দু মিলে যায়। কিন্তু পুঁজির বিচলনের শেষে যদি পুঁজিপতির কাছে সেই পরিমাণ অর্থই থাকে যা সূচনাতে ছিল তাহলে পুঁজির বিচলনটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে। কারণ পুঁজি সঞ্চালনের মূল উদ্দেশ্যই হল মুনাফা।

এখন দেখা যাক কিভাবে মুনাফা সৃষ্টির মধ্যে পুঁজিপতি সম্পদশালী হয়।
প্রথমতঃ    যাদের কাছ থেকে সে পণ্য ক্রয় করে তাদেরকে প্রকৃত দাম না দিয়ে।
দ্বিতীয়তঃ     যাদের কাছে বিক্রি করে তাদেরকে ঠকিয়ে অথবা
তৃতীয়তঃ     উভয়ের ক্ষতি করার মাধ্যমে।

কিন্তু পারস্পরিকভাবে এক পুঁজিপতি আরেক পুঁজিপতিকে ঠকিয়ে মুনাফা করতে পারে না। স্পষ্টতঃ পুঁজিপতিকে এমন এক ধরণের পণ্য খুঁজে বের করতে হয় যা ব্যবহৃত হওয়ার সময়েই মূল্য সৃষ্টি করে। আর এই পণ্যটি হল শ্রমশক্তি। উৎপাদনের অন্যতম অপরিহার্য এই উপাদান শ্রমশক্তি শোষণের মাধ্যমেই পুঁজিপতিরা সাধারণত পুঁজি সৃষ্টি করে শ্রমশক্তির মূল্য পরিমাপ করা হয় শ্রমিকের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের মূল্যের সমান। কিন্তু প্রকৃত শ্রমের মূল্য কখনোই দেয়া হয় না।

আমরা জানি, পুঁজি সঞ্চালনের মূল উদ্দেশ্য হল মুনাফা। নিম্নে একটি উদাহরণের সাহায্যে মুদ্রা হতে মুনাফা সৃষ্টির মাধ্যমে পুঁজিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি দেখানো হলো ঃ

একজন পুঁজিপতিকে উৎপাদন করতে হলে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, জ্বালানী ক্রয় করতে হয়। শ্রমিকের শ্রমশক্তিও খরিদ করে। উৎপাদন শুরু হয়। কাঁচামাল হতে পণ্য উৎপাদন হয় এবং পণ্য বিক্রয় করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে পুঁজিপতি পুনরায় উৎপাদন কার্য সম্পাদন করে। কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয় উৎপাদনের উপকরণের জন্য ব্যয়িত অর্থের পরিমাণের দ্বারা। ধরা যাক, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, জ্বালানী সবকিছুর মূল্য ৩০০০ শ্রমঘন্টা। এছাড়া আরেকটি মূল্য রয়েছে যা শ্রমিকে সৃষ্টি। ২০ জন শ্রমিক ১০ ঘন্টা হিসাবে ৫ দিন কাজ করলে স্পষ্টতই ১০০০ শ্রমঘন্টার মূল্য সৃষ্টি করেছে। ফলে নতুন পণ্যের পূর্ণ মূল্য দাড়ায় ৩০০০+১০০০ = ৪০০০ শ্রমঘন্টা। এটা স্পষ্ট যে, পুজিপতিকে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও জ্বালানী বাবদ ৩০০০ শ্রমঘন্টার সমতুল্য মূল্য দিতে হয়েছে। কিন্তু দেখা যায়, শ্রমিককে ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের সমপরিমাণ মূল্য দেয়া হয়। যা ১০০০ শ্রমঘন্টার সমমূল্যের চেয়ে অনেক কম। যেহেতু শ্রমিক ৫ দিন কাজ করেছে তাই তাদেরকে ৫ দিনের শ্রমশক্তির মূল্য পরিশোধ করে । যার মূল্য দৈনিক ৫ শ্রমঘন্টার সমান। অর্থাৎ একজন শ্রমিক ৫ দিন কাজ করে ২৫টি শ্রমঘন্টার মূল্য পাচ্ছে। এক্ষেত্রে ২০ শ্রমিক পাচ্ছে ৫০০ শ্রমঘন্টার মূল্য। কিন্তু তারা কাজ করছে ১০০০ শ্রমঘন্টা। এই অতিরিক্ত ৫০০ শ্রমঘন্টার মূল্যই হচ্ছে মুনাফা বা পুঁজি।

উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থের পুঁজিতে রূপান্তরের চিত্রঃ
 একই সঙ্গে ব্যবহারমূল্য, উদ্বত্তমূল্য সৃষ্টি ও অর্থের পুঁজিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে নিচের উদাহরণের সাহায্যে দেখানো হলো ঃ

ধরা যাক, কোন পুঁজিপতির সুতাকলে দৈনিক ৮ ঘন্টা শ্রমকলে একজন শ্রমিক ১০০ কিলোগ্রাম সুতা তৈরি করে। এজন্য,

কাঁচামাল ও বিদ্যুৎ ব্যয়    =    ১০০    ডলার
শ্রমের হাতিয়ারের খরচ     =    ৮     ডলার
সুতরাং উপাদানের ব্যয়     =    ১০৪     ডলার
মনেকরি, শ্রমশক্তি ক্রয়ে ব্যয়     =    ৩     ডলার

ধরা যাক, প্রথম ৪ ঘন্টার শ্রমেই শ্রমিক তার শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য (৩ ডলার) পুরোপুরি পুনরুৎপাদন করে এবং বাকি ৪ ঘন্টা উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টিতে (৩ ডলার) ব্যয় করে।

শ্রমিক উৎপাদনকালে (১০৪ ডলার) অক্ষুন্নরাখে এবং এটিকে সুতায় স্থানান্তরিত করে। এছাড়াও ৮ ঘন্টার শ্রমকালে ৬ ডলার সমান নতুন মূল্য সৃষ্টি হয়। শ্রমিক এখানে তার শ্রমের মাধ্যমে শ্রম শক্তির পুনরুৎপাদন মূল্য (৩ ডলার) নয়, ৩ ডলার উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করেছে।

পূর্বোক্ত দৃষ্টিতে ১০০ কিলোগ্রাম সুতা তৈরির জন্য পুঁজিপতি ১০৭ ডলার (১০৪+৩) ব্যয়ে ১১০ ডলার মূল্যের (১০৪+৬) উৎপাদিত পণ্য হস্তগত করেছে। অর্থাৎ তার অর্থ পুঁজিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

শ্রম প্রক্রিয়ায় শ্রমিকের পক্ষে নিজ শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদনের তুলনায় অধিকতর মূল্য সৃষ্টির এই সামর্থ্য পুঁজিপতিদের কোন আবিষ্কার নয়। এটি সমাজের উৎপাদনী শক্তি বিকাশেরই ফলশ্রুতি। পুঁজিপতিরা উৎপাদন উপায় সমূহ কুক্ষিগত করার কারণে এই অর্থকে পুঁজিতে রূপান্তরিত করে এবং তা দিয়ে আবার নতুন শোষণের মাধ্যমে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে।

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: