Components of Good Governance

সুশাসনের উপাদানসমূহ

সুশাসন বলতে সাধারণত কিছু নিয়মনীতিকে বুঝায় যেগুলো সরকারী সংগঠনসমূহের আচার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, নাগরিকদেরকে উদীপ্ত করে, সরকারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং সরকারী-বেসরকারী সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করে। সুশাসনের প্রধান কিছু উপাদান রয়েছে, যেগুলো দূর্নীতি কমাতে নিশ্চয়তা প্রদান করে। সমাজের বর্তমান এবং ভবিষ্যত চাহিদা পূরণের দায়বদ্ধতা সুশাসনের। সুশাসন সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হলে দূর্বল শাসন ব্যবস্থা কি তা জানা প্রয়োজন। এই কারণে সমাজের মধ্যে সকল খারাপ কাজের অন্যতম মূল কারণ হিসাবে বিবেচনা করা হয় দূর্বল শাসন ব্যবস্থাকে। বিশ্বব্যাংকের একটি বইয়ে স্পষ্টভাবে দূর্বল শাসন ব্যবস্থার কিছু লক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হলো-

১। সরকারী এবং বেসরকারী কার্যাবলী পৃথকীকরণে ব্যর্থতা।
২। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা।
৩। নির্বাহী আইন নিয়ন্ত্রণ এবং নিবন্ধনের অভাব।
৪। অগ্রাধিকার, অসামঞ্জস্য উন্নয়ন এর ফলে সম্পদের সঠিক বণ্টণ না হওয়া। ৫। অতিমাত্রায় সংকীর্ণ এবং অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া।

দূর্বল শাসনব্যবস্থার অন্যান্য লক্ষণগুলো হচ্ছে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল, নিম্নমানের সেবা প্রদান এবং লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা।

সুশাসনের প্রধান উপাদানগুলো হচ্ছে –
১। জবাবদিহিতা,
২। অংশগ্রহণ,
৩। আইনের শাসন,
৪। একতা,
৫। মানবাধিকারের প্রতি সম্মান,
৬। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা,
৭। স্বচ্ছতা,
৮। দূর্নীতির অপব্যবহার,
৯। ‌তথ্য অধিকার,
১০। প্রশাসনিক দক্ষতা,
১১। প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা: মেধাভিত্তিক সরকারী চাকুরী।

 অংশগ্রহণঃ
সুশাসনের মূল ভিত্তি হচ্ছে নারী এবং পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণ। UNDP এর মতে অংশগ্রহণ হচ্ছে মানবাধিকার। আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী সংস্থাগুলোর মতে অংশগ্রহণ দুটি উপায়ে উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদান রাখে- রাষ্ট্রের
কার্যকারীতা বৃদ্ধি করে এবং জনগনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, বিশেষ করে গরীবদের। বিশ্বব্যাংক বিশ্বাস করে যে, অংশগ্রহণ উন্নয়নের কার্যকারীতার উন্নয়ন ঘটায়। অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রকে অধিকতর ক্ষমতাশীল করা। টেকসই মানবাধিকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারের একার পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব নয়, তাই কেমন ধরণের উন্নয়ন প্রয়োজন এক্ষেত্রে UNDP গুরুত্ব প্রদান করে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য জনগণ এবং তাদের সংগঠনগুলোর কার্যকরী অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
গণতান্ত্রিক কার্যপ্রণালীতে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে ভোট প্রদান। এই ধরণের সরাসরি অংশগ্রহণ যেমন গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে তেমনি রাজনৈতিক সমতায়নে সহায়তা করে। অংশগ্রহণের একটি শক্তিশালী কাঠামো হচ্ছে মনোনীত দল ব্যবস্থা, যারা স্থানীয় প্রতিষ্ঠান গুলোর প্রতিনিধিত্ব প্রদান করে। এই ধরণের অংশগ্রহণ কোন সংগঠনের উৎপাদন এবং সেবা কার্যক্রমে পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করে। এই ধরণের অংশগ্রহণের প্রধান সুবিধা হচ্ছে এটি গরীবের সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারে।
শক্তিশালী অংশগ্রহণের আরেকটি বড় উপাদান হচ্ছে ক্ষমতায়ন। একজন মানুষ তার নিজস্ব ধারণা কোন উন্নয়নের কাজে লাগাতে চাইলে যখন তার এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তাকে আমরা ক্ষমতায়ন বলতে পারি। নিম্নোক্ত চারটি বিষয় কার্যকরী হলে তখন আমরা বুঝতে পারব যে, ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়েছে- ১) মতামত প্রদানের ক্ষমতা, ২) দক্ষতা, ৩) সমস্যা চিহ্নিতকরণ, ৪) বিচারক্ষমতা

 জবাবদিহিতাঃ
শক্তিশালী রাজনৈতিক জবাবদিহিতা উন্নয়নের উদ্দ্যশ্য অর্জনে সহযোগিতা করে। মানুষের উন্নয়নের সাথে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা জড়িত, কারণ এটি গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন। এটি হচ্ছে সুশাসনের মূল চাবিকাঠি। শুধুমাত্র সর
প্রতিষ্ঠানগুলোই নয়, বেসরকারী এবং সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই জনগণ এবং তাদের স্টোকহোল্ডারদের কাছে জবাবদিহি হতে হবে । যদি রাজনৈতিক জবাবদিহিতা দূর্বল হয় তবে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উভয় উন্নয়নই প্রভাবিত হয়। দূর্নীতি কমানোর মাধ্যমে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রাজনৈতিক জবাবদিহিতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে –

 কার্যকরীকরণ(Enforcement): রাজনৈতিক জবাবদিহিতার প্রথম শর্ত হচ্ছে “অবাধ এবং নিরপেক্ষ”(free & fair) নির্বাচন। “অবাধ” অর্থ প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা ব্যবহারের সমান সুযোগ। নিরপেক্ষ অর্থ নির্বাচনী আইনের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা। একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্বাচন হতে হবে এবং সেটি প্রশাসনের সহায়তায় নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে। গণমাধ্যমগুলো জনগণ এবং সমর্থকদের মতামত তুলে ধরবে যেখানে সরকারের কোন একচেটিয়া প্রভাব থাকবে না। নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য প্রশাসনকে ফলাফল ঘোষণার জন্য তৎপর হতে হবে।

 জবাবদিহি(Answerability): রাজনৈতিক জবাবদিহিতর আর একটি শর্ত হচ্ছে জবাবদিহি। গণমাধ্যমে রাজনৈতিকদের দ্বারা জনগণ পূর্ণ জবাবদিহিতা এবং সমর্থন গ্রহণ করে। দূর্নীতি, টাকার বিনিময়ে ক্ষমতা এবং মানবাধিকার লংঘন এগুলো প্রকাশ করার জন্য স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের প্রয়োজন। জবাবদিহিতার জন্য আইনের প্রয়োজন, যেগুলো নির্বাহী সদস্যদের জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিরোধীদলের কার্যকরী অংশগ্রহণ।

 স্বচ্ছতাঃ
যখন আইন এবং নীতি মেনে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়ন করা হয় তখন তাকে স্বচ্ছতা বলে। এর অর্থ এই যে, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের ফলে যারা প্রভাবিত হবে তারা স্বাধীন ভাবে এবং সরাসরি সে সকল তথ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। অর্থাৎ এটি পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহ করবে যেটি গণমাধ্যমে সহজেই প্রচার করা যাবে। স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে দুটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে – ১) তথ্যের অধিকার এবং ২) তথ্যের পর্যাপ্ততা।

 আইনের শাসনঃ
সুশাসনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ন্যায়সঙ্গত কার্যকাঠামো এবং তার নিরেপেক্ষ ব্যবহার। এছাড়াও এর জন্য প্রয়োজন মানবাধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের। Dicey এর মতে, আইনের শাসনের তিনটি অর্থ রয়েছে :
১। স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা ও আধিপত্য আইনের অনুপস্থিতি-
আইনের শাসন হচ্ছে সাধারণ আইনের প্রকৃত আধিপত্য বিস্তারকারী এবং স্বেচ্ছাচারী আইনের প্রতি বাঁধাদানকারী ক্ষমতা।
২। নিরপেক্ষ আইন-
আইনের শাসনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হচ্ছে নিরপেক্ষ আইন অথবা সকল শ্রেণীর জন্য আইনের সমতা। অর্থাৎ আইনের উর্দ্ধে কেউই নয়।
৩। সংবিধান হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের সাধারণ আইনের ফল-
অনেক দেশে ব্যক্তি স্বাধীনতা, জনসমাবেশ করার স্বাধীনতা এগুলো সংবিধানে লিখিত থাকে। এই অধিকারগুলো বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্তের ফলাফল, যেটি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। সংবিধান কোন উৎস নয় এটি ব্যক্তি অধিকারের ফলশ্রুতি।

রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়াও দারিদ্রতা দূরীকরণে আইনের শাসন প্রয়োজন।

 বিকেন্দ্রীকরণঃ
বিকেন্দ্রীকরণ বলতে শুধুমাত্র প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রত্যার্পন নয়, একইসাথে আর্থিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অর্পনকেও বোঝানো হয়েছে। কোন দেশের যাবতীয় কার্যাবলী সরকারের একার পক্ষে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হয় না, তাই সরকারকে তার কিছু কিছু ক্ষমতা স্থানীয় পর্যায়ে ছেড়ে দিতে হয় যার ফলে সরকারের কার্যাবলীগুলো দক্ষতার সাথে সম্পাদিত হয়। USAID- এর মতে, কার্যকরী বিকেন্দ্রীকরণ স্থানীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক সুযোগ সুবিধা প্রদান করতে পারে এবং জাতীয় রাজনীতির উন্নতিতে সাহায্য করে। “(Effective decentralization can provided exciting opportunities for democratic change at the local level and can help improve national democracy as well).”
World Bank- “Successful decentralization improves the efficiency and responsiveness of the public sector while accommodating potentially explosive political process)”.

বিকেন্দ্রীকরণ গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত/বৈধ করে যখন জনগণকে গণতন্ত্র সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সরকারী সংস্থাগুলোতে বিকেন্দ্রীকরণ হতে দাতা সংস্থাগুলো তিনটি প্রধান সুবিধার উপর গুরুত্ব আরোপ করে,
স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা পূরণে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ অধিকতর কার্যকরী হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
বিকেন্দ্রীকরণ দরিদ্রদেরকে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা প্রদান করতে সহায়তা প্রদান করে।

স্থানীয় পর্যায়ের সংস্থাগুলো বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে তিন ভাবে উপকৃত হতে পারে- সরকারী নীতি অধিকতর দায়িত্বশীল হবে।
গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা
দারিদ্রতা দূরীকরণ
টেকসই উন্নয়নের জন্য অবশ্যই সুশাসনের প্রয়োজন এবং সুশাসনের জন্য উপরোক্ত সকল উপাদানগুলো প্রয়োজন।

বাংলাদেশে সুশাসনের প্রধান উপাদানগুলো বিদ্যমান আছে কি?

গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হচ্ছে সুশাসন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র একটি নতুন বিধান এবং এখনো এটি দূর্বল। বাংলাদেশ সরকার গণতন্ত্রের বিধানকে শক্তিশালী করতে এবং সুশাসনকে তৎপর করতে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

বাংলাদেশে সুশাসনের অন্যান্য উপাদানগুলো নিচে আলোচনা করা হলো –

 জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছ্তাঃ
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সুশাসনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। রাষ্ট্রের নির্বাচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ তাদের সকল কাজের জন্য নাগরিকদের কাছে অবশ্যই জবাবদিহি থাকবে। আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতা সম্ভব শুধুমাত্র রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ এবং সরকারী চাকুরীজীবীরা জবাবদিহি নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়। সংসদীয় সরকার সন্তুষ্টি অর্জন থেকে অনেক দূরে। গত চারটি সংসদীয় সরকার থেকে বাংলাদেশের অনেক তীক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। সংসদীয় পদ্ধতিতে আইন বিভাগের কাছে নির্বাহীদের জবাবদিহিতা করানোর মাধ্যমে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। আইন বিভাগ বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে নির্বাহীদের কার্যক্রমের উপর নজর রাখে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাহীদের উপর সাংসদীয় নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কিছু কিছু উপাদান নিয়ে এক্ষেত্রে বাঁধা প্রদান করে, যেমন- অনভিজ্ঞ আইন বিভাগ এবং সরকারী পরিকল্পনায় অনিচ্ছা।

 বিচার বিভাগের স্বাধীনতাঃ
সুশাসনের আধুনিক ধারণাটি হচ্ছে শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকারী প্রতিষ্ঠান গুলোর কার্যকলাপের প্রতি জনগণের বিশ্বাস থাকা প্রয়োজন। সরকারী প্রতিষ্ঠান গুলো বিচার বিভাগের উপর নির্ভরশীল। কারণ সরকারী প্রতিষ্ঠান গুলোতে ক্ষমতার যে অপব্যবহার হয় তা বিচার বিভাগ তদন্ত করতে পারে। সুশাসনের জন্য একটি সুষ্ঠ বিচার বিভাগের প্রয়োজন। বাংলাদেশ সংবিধানে ১৯৭৫ সালে ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগের অধীনস্থ করা হয়। বাংলাদেশ সংবিধান অনুসারে, “রাষ্ট্রের শাসন অঙ্গ সমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।”
১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর সকল সরকার দাবী করে স্বাধীন বিচার বিভাগের কিন্তু তাঁরা বাস্তবায়নের জন্য সচেতন ছিল না। শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণের কথা যদিও সংবিধানের ২২নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা রয়েছে কিন্তু কোন সংসদীয় সরকারই এর জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। কিন্তু ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের জন্য একটি বিল অনুমোদন করে এবং এটি একই বছরের ১লা নভেম্বর হতে কার্যকরী হয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এটি বাংলাদেশের একটি নবযুগের সূচনা করে।

 দূর্নীতিঃ
বাংলাদেশের সুশাসনের ক্ষেত্রে একটি বড় বাঁধা হচ্ছে দূর্নীতি। বিশ্বের যে কোন দেশের সুশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হচ্ছে সরকারী অঙ্গ-সংগঠনগুলো থেকে দূর্নীতি কমানো। সরকারী ক্ষেত্রে দূর্নীতির বিরোধীতার জন্য যে রাজনৈতিক অনিচ্ছা রয়েছে, স্বাধীনতার ৩৫ বছরেরও বেশি সময়ের পর এখন স্বাধীন দূর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হচ্ছে এটি তাই প্রমাণ করে। দূর্নীতি জাতীয় সম্পদের সঠিক বণ্টণে বাঁধা প্রদান করে এবং ধনী ও গরীবের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ সংবিধান অনুসারে, “সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ প্রতিষ্ঠার জন্য বিধান করতে পারবেন।” ন্যায়পালকে মন্ত্রণালয় যে ধরণের ক্ষমতা প্রদান করবে ন্যায়পাল সেইরূপ ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কোন সংসদীয় সরকার এর প্রতিষ্ঠার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। ন্যায়পাল দূর্নীতি কমাতে পারে কারণ বাংলাদেশ সংবিধান কর্তৃক তাকে ক্ষমতা প্রদান করা হয়।

 আইনের শাসনঃ
একটি রাষ্ট্র তখনই সুন্দরভাবে পরিচালিত হবে যখন আইনের শাসনের উন্নয়ন ঘটবে। গত সরকারী দল (২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত) কিছু নতুন আইন তৈরী করেছিল। সুশাসনের জন্য আইনের শাসন অন্যতম প্রধান বিষয় কিন্তু এটি Rapid Action Battalion (RAB) দ্বারা অতি মাত্রায় আইনসঙ্গত হত্যা বৃদ্ধি করেছে। সংবিধান অনুসারে আইনের শাসনের সাথে সম্পৃক্ত কিছু অনুচ্ছেদ রয়েছে, যেগুলো আইনের শাসনে সহায়তা করে। সংবিধানের ২৭নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” সংবিধানের ৩১নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “আই‌নের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষতঃ আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।”
৪৪নং এবং ১০২নং অনুচ্ছেদ ১৮টি মৌলিক নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।সংবিধানের ৭(১), ১১, ৫৫, ৫৬, ৫৭ এবং ৬৫(২) অনুচ্ছেদের দ্বারা যে প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে তাঁরা জনগনের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। ‌সংবিধানের এই অনুচ্ছেদগুলো কার্যকরী করার মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সাধারণত বলা হয়ে থাকে যে, আইন হচ্ছে সুবিধা ভোগী শ্রেণীর জন্য। এতে সাধারণ জনগণ যেমন অবহেলিত হয় তেমন ন্যয় বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।

 বিকেন্দ্রীকরণঃ
বিকেন্দ্রীকরণের অনেক সুবিধা রয়েছে বিশেষ করে সরকার যখন স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়। স্থানীয় সরকার এবং সম্প্রদায়গুলো তাদের অবস্থা সম্পর্কে জানে এবং তাদের চাহিদার জন্য দায়ী। বিকেন্দ্রীকরণ জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করে। জনগণ এর মাধ্যমে সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দৈনন্দিন কার্যাবলী দেখতে পারে ফলে দূর্নীতির সম্ভাবনা কম থাকে। বিকেন্দ্রীকরণ হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে সরকারের স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাথমিক কৌশল। বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারের তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র আনয়নের জন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ পদ্ধতি রয়েছে।
সারাদেশে বিভিন্ন পৌর এলাকা রয়েছে এবং এটি বিকেন্দ্রীভূত কিন্তু প্রকৃত পক্ষে সঠিক আইনের অভাবে এবং অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কারণে স্থানীয় সরকার পদ্ধতির উন্নয়ন সম্ভব হয় না। এই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো খুবই
দূর্নীতিগ্রস্থ এবং মোটেও জবাবদিহি নয়। বাংলাদেশ সংবিধানের ৫৯নং অনুচ্ছেদে বিকেন্দ্রীকরণের কথা উল্লেখ রয়েছে যেটি স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু হবে কিন্তু এটি সংবিধানেই আছে তার কোন বাস্তব প্রয়োগ নেই।  মানবাধিকারঃ
সুশাসনের পূর্বশর্ত হচ্ছে মানবাধিকার। বাংলাদেশ সরকারের মানবাধিকার রিপোর্ট খুবই দূর্বল। এর বিভিন্ন ধরণের অপব্যবহার হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর উপর অধিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে যেটি অতিমাত্রায় আইনগত হত্যা বৃদ্ধি করছে। পুলিশ প্রায়ই বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মারাত্মক দাঙ্গার সৃষ্টি করে এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের উপর ব্যাপক মাত্রায় শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করে।
একটি অনুন্নত দেশে সরকার তার জনগণের মৌলিক অধিকার অর্থাৎ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।
বাংলাদেশ সংবিধানের ২(ক) নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্ম প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাইবে।” সংবিধান প্রত্যেক জনগণের ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা প্রদান করবে অনুচ্ছেদ ৪১(১,ক)।
এটি উল্লেখ করতে হয় যে, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর দেশে অরাজকতা এবং হত্যা উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছিল। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার, ধর্ষণ, খুন এবং ডাকাতি বৃদ্ধি পায়। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার BNP সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর ভোলার চর এলাকায় ১০জন হিন্দু মহিলাকে ধর্ষণ করা হয় এবং ৫৩টি বাড়ী ডাকাতি করা হয়। ২০০৬ সালে সারা বাংলাদেশে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে। বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রায় ২০০০ লোক আহত হয় এবং ১২জন লোক নিহত হয়।
উপরোক্ত বিষয়গুলো আইন অমান্য করার প্রমাণ বহন করে যেটি সাধারণ জীবন যাপনের জন্য হুমকি স্বরূপ। সংবিধান অত্যাচার, অমানবিকতা এবং নৃশংসতার বিরোধী।
বাংলাদেশ পুনর্বাসন কেন্দ্র এর মতে, ১২৯৬জন ব্যক্তিকে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক অত্যাচার করা হয় এবং অত্যাচারের সময় ১১৫জন মৃত্যু বরণ করে। বিশ্বব্যাংকের একটি জরিপের মাধ্যমে ২০০৪ সালে ২০৯টি নিম্ন-আয়ের দেশগুলোর শাসন ব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ সর্বনিম্ন অবস্থান অর্জন করে। এটি ৬টি মূল বিষয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়-
১) বাকস্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা
২) রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অরাজকতার অনুপস্থিতি
৩) সরকারের কার্যকারীতা
৪) আইনগত অবস্থা
৫) আইনের শাসন এবং
৬) দূর্নীতি নিয়ন্ত্রণ

উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পেয়ে থাকি এবং এর উপর ভিত্তি করে আমরা বলতে পারি যে, বাংলাদেশের সুশাসন ব্যবস্থা সর্বোপরি সন্তুষজনক অবস্থানে রয়েছে।

“They may forget what you said, but they will never forget how you made them feel”
-Carl W. Bucchner

8 Responses

  1. I’ve recently started a web site, the info you offer on this site has helped me greatly. Thank you for all of your time & work.

    Like

  2. Wow, that’s great, I have to be doing something right with my SEO Glad to be of help, it’s about time Twitter had an option to remove many of the DMs in a single go..

    Like

  3. I just enjoy Infographics! I actually like infographics on social media and time management. I used to be thinking that an individual day I should draw a time management infographic for freelancers😀

    Like

  4. A few comments.
    As a freelancer for more than a decade, I have in no way established up my own internet site for my work.
    However, I do have a very Facebook website that focuses on me as a writer.
    Websites are fine-if you’ve enough work to fill up one particular.
    My recommendation is start out with a Facebook site-plenty of traffic there.
    Also, I’d personally recommend having a presence on sites like Linked In.
    Editors will not mind you sending them your perform.
    That’s a tip from? a smartass.

    Like

  5. Time to refresh the wallpaper.

    Like

  6. Thanks! This is the best tip yet for developers who do a lot of html and php extension changes.

    Like

  7. Amazing, cant belive to win but give it a try tweeted => https://twitter.com/#!/endgeek/status/198318073315463168

    Like

  8. Good day! This is my 1st comment here so I just wanted to give a quick shout out and tell you I really enjoy reading through your articles. Can you recommend any other blogs/websites/forums that go over the same topics? Many thanks!

    Like

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: